চাঁদপুর জেলার পরিচিতি

0
48

চাঁদপুর জেলা (chandpur) বাংলাদেশের একটি জেলা। এটি চট্টগ্রাম বিভাগ এর অন্তর্গত। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্হলে এ জেলা অবস্থিত। চাঁদপুরের মানুষ আতিথেয়তার জন্য বিখ্যাত। ইলিশ মাছের অন্যতম প্রজনন অঞ্চল হিসেবে চাঁদপুরকে “ইলিশের বাড়ি ” নামে ডাকা হয়। ১৯৮৪ সালের আগ পর্যন্ত এটি বৃহত্তর কুমিল্লার একটি অংশ ছিল। চাঁদপুর (chandpur) জেলার উত্তরে মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলা, দক্ষিণে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরবরিশাল জেলা পূর্বে কুমিল্লা জেলা এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী, শরিয়তপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলা অবস্থিত।

চাঁদপুর জেলার পটভূমি (chandpur)

মেঘনা, ডাকাতিয়া, ধনাগোদা নদীর কোল জুড়ে ১৭০৪.০৬ বর্গ কি.মি. আয়তনের ঘন সবুজ ভূ-খন্ডের নাম চাঁদপুর। এই ভূখন্ডের বুকে পরম যতন আর আদরের মাঝে বসবাস করে ২৬,০০,২৬৩ জন মানুষ। আকাশের চাঁদ জ্যোৎস্না হয়ে ঝরে পড়ে এই সবুজ ভূখন্ডে। আচ্ছাদিত করে রাখে হাজার বছরের বিকশিত সভ্যতার এক সমৃদ্ধ জনপদকে। স্নিগ্ধ আলোর উৎস হচ্ছে চাঁদ, লোকালয়, নিকেতন অথবা গ্রাম জনপদ হচ্ছে পুর। এ দুয়ের সমন্বয়ে গড়া জনপদ হচ্ছে চাঁদপুর। ফিরে তাকাই চাঁদপুরের (chandpur) ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিকে।

চাঁদপুর জেলার নামকরণ

১৭৭৯ খ্রি. ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজ জরিপকারী মেজর জেমস্ রেনেল তৎকালীন বাংলার যে মানচিত্র এঁকেছিলেন তাতে চাঁদপুর (chandpur) নামে এক অখ্যাত জনপদ ছিল। তখন চাঁদপুরের দক্ষিণে নরসিংহপুর নামক (যা বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন) স্থানে চাঁদপুরের অফিস-আদালত ছিল। পদ্মা ও মেঘনার সঙ্গমস্থল ছিল বর্তমান স্থান হতে প্রায় ৬০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। মেঘনা নদীর ভাঙ্গাগড়ার খেলায় এ এলাকা বর্তমানে বিলীন হয়েছে। বার ভূঁইয়াদের আমলে চাঁদপুর অঞ্চল বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদরায়ের দখলে ছিল। এ অঞ্চলে তিনি একটি শাসনকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। ইতিহাসবিদ জে. এম. সেনগুপ্তের মতে, চাঁদরায়ের নাম অনুসারে এ অঞ্চলের নাম হয়েছে চাঁদপুর। অন্যমতে, চাঁদপুর (chandpur) শহরের (কোড়ালিয়া) পুরিন্দপুর মহল্লার চাঁদ ফকিরের নাম অনুসারে এ অঞ্চলের নাম চাঁদপুর। কারো মতে, শাহ আহমেদ চাঁদ নামে একজন প্রশাসক দিল্লী থেকে পঞ্চদশ শতকে এখানে এসে একটি নদীবন্দর স্থাপন করেছিলেন। তার নামানুসারে নাম হয়েছে চাঁদপুর। তিনি বাস করতেন পুরিন্দপুর এলাকায়। হাজীগঞ্জের ফিরোজশাহী মসজিদ মুসলিম স্থাপত্য কীর্তির অন্যতম নিদর্শন। যেটি ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের দেওয়ান ফিরোজখান লস্কর নির্মাণ করেছেন বলে শিলালিপি থেকে জানা যায়। হাজীগঞ্জ উপজেলাধীন অলিপুর গ্রামে প্রখ্যাত মোঘল শাসক আব্দুল্লাহর প্রশাসনিক সদর দপ্তর ছিল। এখানে রয়েছে বাদশাহ আলমগীরের নামাঙ্কিত বিখ্যাত আলমগীরি পাঁচ গম্বুজ মসজিদ, শাহাজাদা সুজা স্থাপিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ ও মোঘল আমলের বীর সেনানায়কদের শানবাঁধানো মাজার যা বর্তমানে অলিদের মাজার নামে খ্যাত। ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনিক পূর্ণবিন্যাসের ফলে ১৮৭৮ সালে প্রথম চাঁদপুর মহকুমার সৃষ্টি হয়। ১৮৯৬ সালের ১ অক্টোবর চাঁদপুর শহরকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৪ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

বর্তমান চাঁদপুর (chandpur) প্রাচীন বঙ্গে সমতট রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। খ্রিস্টিয় সপ্তম শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদের শেষ দিকে চৈনিক পরিব্রাজক ওয়ান চোয়াঙ সমতট রাজ্যে আগমন করেছিলেন বলে তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে পাওয়া যায়। তিনি সমতটকে সমুদ্র তীরবর্তী নিম্ন আদ্র-ভূমি রূপে বর্ণনা করেছেন যা এই অঞ্চলকে বুঝায়। প্রাচীন বাংলার গুপ্ত পাল ও সেন রাজবংশের রাজারা এই অঞ্চল শাসন করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এলাকার কোনো স্বতন্ত্র আদি নাম সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ-বিন-বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের পর সমগ্র বাংলা মুসলিম শাসনের অধিকারে আসার সাথে সাথে এ অঞ্চলও স্বাভাবিকভাবে মুসলিম শাসনের অন্তর্ভূক্ত হয়। বিশেষ করে সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ এ অঞ্চলে শাসন করেছেন এমন প্রমাণ ইতিহাসে রয়েছে।

জে. এফ. ব্রাইনী সি. এস.-এর মতে রাজা টোডরমল ১৫৮৮ খ্রি. মোগল প্রশাসনের জন্যে ১৯টি বিভাগের প্রবর্তন করেন। এ ১৯টি বিভাগের মধ্যে একটি বিভাগ হলো সোনারগাঁও সরকার এবং এর মধ্যে ত্রিপুরা ও নোয়াখালী অন্তর্ভূক্ত ছিল। ১৭২২ খ্রি. পর্যন্ত টোডরমলের মূল সরকার এবং শাহ সুজা কর্তৃক ১৬৫৮ সালে সংযুক্ত ১৩টি চাকলা বা সামরিক অধিক্ষেত্রের ১টি ঢাকা বা জাহাঙ্গীরনগর নামে পরিচিত ছিল। ১৯৬০ খ্রি. পর্যন্ত জেলার নাম ছিল ত্রিপুরা জেলা। তখন এ জেলা ৪টি মহকুমা নিয়ে গঠিত ছিল। তা হলো: সদর উত্তর, সদর দক্ষিণ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর। তখন ২১টি থানা ও ৩৬২টি ইউনিয়ন কাউন্সিল ছিল। চাঁদপুর মহকুমায় ৫টি থানা ছিল। তা হলো- চাঁদপুর, ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ, কচুয়া ও মতলব।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি

মুক্তিযুদ্ধের সময় চাঁদপুর ২নং সেক্টরের অধীনে ছিল। ১৯৭১ সালের ১২ মে পাকবাহিনী হাজীগঞ্জ উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের ৫০ জন লোককে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এ গণহত্যার পর মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালালে পাকবাহিনীর ১৭ জন সৈন্য নিহত এবং ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। শাহরাস্তি উপজেলার নাওড়া, সূচীপাড়া এবং উনকিলার পূর্বাংশে বেলপুরের কাছে মিত্র বাহিনীর সাথে পাকবাহিনীর সংঘর্ষে মিত্র বাহিনীর ১৩ জন সৈন্য এবং পাকবাহিনীর ৩৫ জন সৈন্য নিহত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় মতলব উত্তর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ২৮ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত চাঁদপুর শত্রু মুক্ত হতে থাকে। ৭ এপ্রিল সকাল ৯টায় পাক হানাদার বাহিনী প্রথম চাঁদপুরের পুরাণবাজারে বিমান হামলা চালায়। চাঁদপুরের (chandpur) বেশ কয়েকটি স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক হানাদার বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এদের মধ্যে বাবুরহাট, টেকনিক্যাল হাইস্কুল, বাখরপুর মজুমদার বাড়ি, ফরিদগঞ্জ-এর গাজীপুর ওটতলী নামক স্থান অন্যতম। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১০টায় চাঁদপুর সম্পূর্ণরূপে শত্রু মুক্ত হয়। ১৯৮৪ সালে চাঁদপুর মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয়।

চাঁদপুর জেলার ভৌগলিক পরিচিতি

তৎকালীন ত্রিপুরা জেলা পরবর্তীতে যা কুমিল্লা নামে পরিচিত যে তিনটি মহকুমা নিয়ে গঠিত ছিল চাঁদপুর (chandpur) তাদের অন্যতম। চাঁদপুর নামক এই জনপদটির ইতিহাস হাজার বছরের হলেও এর নামকরণের বয়স সাতশ বছরের বেশি নয়। মেঘনা, ডাকাতিয়া, ধনাগোদা নদীর কোল জুড়ে প্রায় বর্গাকার একটুকরো ঘন সবুজ ভূখন্ড নাম চাঁদপুর।

চাঁদপুর (chandpur) জেলার ভূ-তাত্ত্বিক গঠন হয়েছে প্লাইস্টোসিন ও হলোসীন যুগে। চাঁদপুর জেলার ভৌগোলিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায় পার্গিটার রচিত পূর্ব-ভারতীয় দেশসমূহের প্রাচীনকালের মানচিত্রে। এই মানচিত্রে আজকের বাংলাদেশের এই অঞ্চলের দক্ষিণে সাগরনূপের, উত্তরে প্রাগজ্যোতিষ ও পূর্ব ভাগের পাহাড়ের পাদদেশের অঞ্চল ‘কিরাতাস’ নামে অভিহিত ছিল। তৎকালীন লোহিত নদীর (আজকের ব্রক্ষ্মপুত্র নদী) পলি দ্বারা ‘কিরাতাস’ অঞ্চল গঠিত। ‘কিরাতাস’ অঞ্চলের অধিকাংশ স্থান নিয়েই তৎকালীন কুমিল্লা জেলা গঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ চাঁদপুর জেলাও উক্ত ‘কিরাতাস’ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। টমাস ওয়াটারের মানচিত্রে পূর্ব-ভারতীয় অঞ্চলের এ স্থানে তিতাস ও সম্ভবতঃ গোমতী নদীর গতিপথের দক্ষিণে ‘শ্রীক্ষেত্র’ নামক স্থানের অবস্থান দেখানো হয়েছে। বর্তমান চাঁদপুর জেলা এবং নোয়াখালী জেলার পশ্চিমাংশ নিয়ে তৎকালীন ‘শ্রীক্ষেত্র’ গঠিত হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।

১৫৬০ খ্রিস্টাব্দের জীন্ ডি ব্যারোসের মানচিত্রে নদী তীরবর্তী ‘ট্রপো’র অবস্থান দেখানো হয়েছে। উক্ত ‘ট্রপো’ তৎকালীন ত্রিপুরা জেলা বা কুমিল্লা অঞ্চল। সুতরাং বর্তমান চাঁদপুরের (chandpur) ভৌগলিক অবস্থান নিকট ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পাওয়া যায়। ১৬৫২ সালে পর্জুগীজ নাবিক স্যানসন দ্যা আবেভিল অঙ্কিত মানচিত্রে বান্দের নাম চিহ্নিত স্থানে একটি বড় নদী বন্দর ছিলো এবং সেটি চাঁদপুর বন্দর ছিলো। ১৭৭৯ খ্রি. ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজ জরিপকারী মেজর জেমস্ রেনেল তৎকালীন বাংলার যে মানচিত্র এঁকেছিলেন তাতে কেবলমাত্র ত্রিপুরা জেলাই দেখানো হয়নি– চাঁদপুর ও কুমিল্লার সঠিক অবস্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই জেলার উত্তরে মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলা, দক্ষিণে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও বরিশাল জেলা পূর্বে কুমিল্লা জেলা এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী, শরিয়তপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলা।

জেলার তথ্যাবলী

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

chadpur

চাঁদপুর জেলার অভ্যন্তরীণ মানচিত্র

চাঁদপুরে ০৭ টি পৌরসভা, ৬০ টি ওয়ার্ড, ২৭৫ টি মহল্লা, ৮ টি উপজেলা, ৮ টি পুলিশ থানা,২ টি নৌ থানা, ১ টি কোস্ট গার্ড স্টেশন,১ টি রেল থানা, ৮৯ টি ইউনিয়ন এবং ১২২৬ টি গ্রাম রয়েছে। এই জেলা আটটি উপজেলা নিয়ে গঠিত; এগুলো হচ্ছে:-

  • চাঁদপুর সদর উপজেলা
  • হাজীগঞ্জ উপজেলা
  • কচুয়া উপজেলা
  • ফরিদগঞ্জ উপজেলা
  • মতলব উত্তর উপজেলা
  • মতলব দক্ষিণ উপজেলা
  • শাহরাস্তি উপজেলা
  • হাইমচর উপজেলা

চাঁদপুর সদর উপজেলা

আয়তন (বর্গ কিলোমিটারে): ৩০৮.৭৯
প্রশাসনিক থানা: চাঁদপুর সদর
আওতাধীন ইউনিয়ন(১৪টি): বিষ্ণুপুর, আশিকাটি,কল্যাণপুর, শাহ মাহমুদপুর, রামপুর, মৈশাদী,তরপুরচণ্ডী,বাগাদী, বালিয়া, লক্ষ্মীপুর,  ইব্রাহিমপুর, চান্দ্রা, হানারচর এবং  রাজরাজেশ্বর

হাজীগঞ্জ উপজেলা

আয়তন (বর্গ কিলোমিটারে):  ১৮৯.৯০
প্রশাসনিক থানা: হাজীগঞ্জ
আওতাধীন ইউনিয়ন: (১১টি): রাজারগাঁও উত্তর, বাকিলা, কালচোঁ উত্তর, কালচোঁ দক্ষিণ, হাজীগঞ্জ সদর, বড়কুল পূর্ব, বড়কুল পশ্চিম, হাটিলা পূর্ব, গন্ধর্ব্যপুর উত্তর, গন্ধর্ব্যপুর দক্ষিণ, হাটিলা পশ্চিম এবং দ্বাদশ গ্রাম

কচুয়া উপজেলা

আয়তন (বর্গ কিলোমিটারে): ২৩৫.৮২
প্রশাসনিক থানা: কচুয়া
আওতাধীন ইউনিয়ন: (১২টি): সাচার, পাথৈর, বিতারা, পালাখাল, সহদেবপুর পশ্চিম, কচুয়া উত্তর, কচুয়া দক্ষিণ, কাদলা, কড়ইয়া, গোহট উত্তর, গোহট দক্ষিণ এবং আশরাফপুর

ফরিদগঞ্জ উপজেলা

আয়তন (বর্গ কিলোমিটারে): ২৩১.৫৪
প্রশাসনিক থানা: ফরিদগঞ্জ
আওতাধীন ইউনিয়ন (১৫টি): বালিথুবা পশ্চিম, বালিথুবা পূর্ব, সুবিদপুর পূর্ব, সুবিদপুর পশ্চিম, গুপ্টি পূর্ব, গুপ্টি পশ্চিম, পাইকপাড়া উত্তর, পাইকপাড়া দক্ষিণ, গোবিন্দপুর উত্তর, গোবিন্দপুর দক্ষিণ, চর দুঃখিয়া পূর্ব, চর দুঃখিয়া পশ্চিম, ফরিদগঞ্জ দক্ষিণ, রূপসা উত্তর এবং রূপসা দক্ষিণ

মতলব উত্তর উপজেলা

আয়তন (বর্গ কিলোমিটারে): ২৭৭.৫৩
প্রশাসনিক থানা: ছেংগারচর
আওতাধীন ইউনিয়ন (১৪টি):  ষাটনল, বাগানবাড়ী, সাদুল্লাপুর, দুর্গাপুর, কলাকান্দা, মোহনপুর,এখলাছপুর, জহিরাবাদ, ফতেপুর পূর্ব,  ফতেপুর পশ্চিম, ফরাজিকান্দি, ইসলামাবাদ, সুলতানাবাদ এবং গজরা

মতলব দক্ষিণ উপজেলা

আয়তন (বর্গ কিলোমিটারে): ১৩১.৬৯
প্রশাসনিক থানা: মতলব
আওতাধীন ইউনিয়ন (৬টি): নায়েরগাঁও উত্তর, নায়েরগাঁও দক্ষিণ, খাদেরগাঁও, নারায়ণপুর, উপাদী উত্তর এবং উপাদী দক্ষিণ

শাহরাস্তি উপজেলা 

আয়তন (বর্গ কিলোমিটারে): ১৫৪.৩১
প্রশাসনিক থানা: শাহরাস্তি
আওতাধীন ইউনিয়ন (১০টি): টামটা উত্তর, টামটা দক্ষিণ, মেহের উত্তর, মেহের দক্ষিণ, রায়শ্রী উত্তর, রায়শ্রী দক্ষিণ, সূচীপাড়া উত্তর,  সূচীপাড়া দক্ষিণ, চিতোষী পূর্ব এবং চিতোষী পশ্চিম

হাইমচর উপজেলা
আয়তন (বর্গ কিলোমিটারে): ১৭৪.৪৯
আওতাধীন ইউনিয়ন (৬টি): গাজীপুর, আলগী দুর্গাপুর উত্তর, আলগী দুর্গাপুর দক্ষিণ, নীলকমল, হাইমচর এবং চর ভৈরবী

জনসংখ্যা

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী চাঁদপুর (chandpur) জেলার মোট জনসংখ্যা ২৪, ১৬,০১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১১,৪৫,৮৩১ জন এবং মহিলা ১২,৭০,১৮৭ জন। মোট পরিবার ৫,০৬,৫২১টি। মোট জনসংখ্যার ৯৩.৫৪% মুসলিম, ৬.৩৮% হিন্দু এবং ০.০৮% বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারী। এছাড়া কিছু সংখ্যক ত্রিপুরা উপজাতি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে এ জেলায়

চাঁদপুর জেলার ঐতিহ্য

সুপ্রাচীনকাল থেকেই এদেশে মানুষের বসবাস ছিলো। চতুর্থ বরফ যুগ শেষ হয়েছে পঁচিশ হাজার বছর আগে। এ যুগে ভারতের উত্তরাঞ্চলের অধিবাসীরা বরফের হাত থেকে বাঁচার জন্যে এই নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের পাহাড়ী এলাকাসমূহে এসে ব্যাপকভাবে বসতি স্থাপন করে। এদের উত্তর পুরুষেরাই এদেশের গারো, হাজং কোচ, খাসিয়া, চাকমা, মোরং প্রভৃতি উপজাতি। এরাই বাংলার আদি মানুষ। বর্তমান চাঁদপুর জেলায় এ রকম কোনো আদিবাসীর বসবাস ছিলো না।
মধ্য ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকা ও বাংলার গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বিধৌত বিস্তৃত সমতলভূমি গড়ে উঠার বহু পূর্বেই সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, ময়মনসিংহের পাহাড়ী এলাকা, ভাওয়াল ও মধুপুরের পাহাড়ী এলাকা সমূহের সৃষ্টি হয়েছিলো। উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমিও ছিলো বেশ পুরানো এলাকা। চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী ও ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ী এলাকাসমূহই বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো স্থলভূমি। এই পাহাড় এলাকাগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথেই। হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছিল কোটি কোটি বছর পূর্বে এক বিরাট ভূ-বিপর্যয়ের মাধ্যমে। বর্তমানের হিমালয় পর্বতমালা ও তৎসন্নিহিত এক বিশাল অঞ্চল নিমজ্জিত ছিলো সমুদ্রগর্ভে। বর্তমানের দক্ষিণ ভারতের বিন্ধ্যা পর্বতশ্রেণী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলো সেই মহাসমুদ্রে। বর্তমানের ভারত মহাসাগরের বিরাট এলাকা জুড়ে ছিলো এক বিশাল স্থলভূমি। সেই বিপুল ভূ-বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্টি হলো হিমালয় পর্বতমালার; আর সমুদ্র গর্ভে তলিয়ে গেলো দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণের সেই বিশাল স্থলভূমি, যার নাম এখন ভারত মহাসাগর। এ হচ্ছে প্রাচীন বাংলা ভূ-খন্ডের ইতিহাস।
এরপর কোটি কোটি বছর থেকে হিমালয়ের বিশাল পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে আর দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে নেমে আসছে অসংখ্য নদ-নদী। ফলে হিমালয় থেকে কোটি কোটি টন বালি মাটি নেমে আসছে প্রতি বছর নিম্ন এলাকায়। এমনিভাবে সৃষ্টি হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের বিশাল পলিমাটি এলাকা-এই পলল সমভূমি। এক কথায় সমতল ভূমির সৃষ্টি। সর্বশেষ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের পলিমাটি অঞ্চল। তাই এ অঞ্চলের বয়স সবচেয়ে কম। এই পলিমাটি অঞ্চল এখনো বেড়েই চলেছে। আমাদের চাঁদপুর জেলার বেশিরভাগ অংশ সৃষ্টি হয়েছে হাজার দেড় হাজার বছর আগে।
মধ্য ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকায় ছিলো অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়দের বাস। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনায় পলিমাটি এলাকা যতই ভরাট হয়ে বিস্তৃত হতে থাকে এই অঞ্চলের মানুষ ততোই দক্ষিণ দিকে নূতন পলিমাটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
বাংলাদেশের পলিমাটি এলাকা গড়ে ওঠার বহু পূর্বেই এদেশের পাহাড়ী এলাকায় গড়ে উঠেছিলো মানুষের বসবাস। তাই এসব এলাকাতেই পাওয়া গেছে প্রাচীন সব প্রত্নসম্পদ। চাঁদপুর (chandpur) জেলার প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহের নির্মাণকাল হাজার বছর অতিক্রম করেনি। সুলতানী আমলের খুব বেশি প্রত্নকীর্তির নিদর্শনও এ জেলায় নেই। তবে হাজীগঞ্জ থানার ফিরোজ শাহ মসজিদ ও ‘হদ্দিনের হথ’ এ জেলার সুলতানী আমলের প্রত্নকীর্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শের শাহের আমলে নির্মিত ‘জাঙ্গাল’ এ জেলার পাঠান আমলের কীর্তি। শুজা মসজিদ, আলমগিরী মসজিদ মোঘল আমলের আরও অনেক মসজিদ এ জেলায় দেখা যায়। মুসলমান আমলের এসব কীর্তি এ জেলায় মুসলমান অধিকারের সুস্পষ্ট চিহ্ন বহন করে।
মেঘনা কন্যা চাঁদপুরকে নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কেউ বলেন, ‘রূপসী চাঁদপুর’, কেউ বলেন ‘ইলিশের দেশ চাঁদপুর’। আবার কেউ চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা মধুকরের পালতোলা জাহাজের নোঙর খুঁজে বেড়ান চাঁদপুর জনপদে। এভাবেই নানাজনের নানা ভাবনায় সুদীর্ঘ সময়ের পথ পরিক্রমায় ঐতিহ্য আর আদর্শের নীরব সাক্ষী চাঁদপুর। মেঘনা-ডাকাতিয়া আর ধনাগোদা নদীর জলধারায় বিধৌত দেশের অন্যতম বাণিজ্য বসতির জনপদ এই শ্যামলী চাঁদপুর। এই জেলার সদর দপ্তরও চাঁদপুর নামক শহরে অবস্থিত। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর এই শহরটিকে ঘিরে গড়ে ওঠেছে। চাঁদপুর (chandpur) নামে জনপদ হাজার বছরের পথচলায় প্রত্যক্ষ করেছে প্রকৃতির নানা লীলাখেলা। ভূমিকম্প, বন্যা আর নদীর ভাঙ্গনে বারে বারে বিপর্যস্ত হয়েছে কিন্তু কোনো শক্তির দাপটের কাছে হার মানেনি চাঁদপুর, সে মানুষই হোক কিংবা প্রকৃতি। ঐতিহ্যবাহী এক সময়ের মহকুমা শহর, ‘‘Gate way of Eastern India” আজকের জেলা চাঁদপুর। শত নয়, হাজার বছরের প্রাচীন জনপদ এই চাঁদপুর। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সময় থেকে প্রাচীন বাংলার এক সমৃদ্ধ নগরী চাঁদপুর। বিশিষ্ট চাঁদ ফকির, জমিদার চাঁদ রায় ও ধনাঢ্য বণিক চাঁদ সওদাগরের নামে এ ত্রয়ীযুগলবন্দীতে নামাঙ্কিত চাঁদপুর। এ যুগলবন্দীর নামের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালে প্রথমেই দৃষ্টিগোচর হয় পুরন্দপুর গ্রাম ও চাঁদ ফকিরের স্মৃতি। কোড়ালিয়া ও পুরন্দপুর গ্রামে চাঁদ ফকির এলমে তাসাউফের বায়াত দিতেন। একদা কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর বাস ছিলো। চাঁদপুরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার প্রত্নসম্পদ।
হাজীগঞ্জ উপজেলার কালোচোঁ উত্তর ইউনিয়নের ফিরোজপুর গ্রামে সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের আমলে নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটিই হচ্ছে সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্নসম্পদ। প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৩৪৪ সালে অর্থাৎ হিজরী ৭৪৫ সনে সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে ফৌজদার দেওয়ান ফিরোজ খান লস্কর তিন গম্বুজ বিশিষ্ট অনুপম সুন্দর মসজিদ ও একটি বিশালাকার দিঘি খনন করেন। ফিরোজ খান লস্করের দাঁড়া নামে একটি নৌপথ তৈরি করেন।

চাঁদপুর জেলার ভাষা সংস্কৃতি

সমগ্র উপজেলায় বাংলা ভাষা প্রচলিত, তবে কিছু কিছু শব্দের উচ্চারণে আঞ্চলিকতার প্রভাব রয়েছে। চাঁদপুর (chandpur) জেলার  ভূ-প্রকৃতি ও ভৈাগলিক অবস্থান মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে।চাঁদপুর জেলার মানুষ সাধারনত চাঁদপুর এর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। যেহেতু চাঁদপুর জেলার বাজারে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই জন্য এখানে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত আছে। এছাড়া ও এখানে বাংলা সংস্কৃতি ঐতিহ্য বাহি অনুষ্ঠান গুলো খুব দুমদাম ভাবে পালন করা হয়। বাংলা সংস্কৃতি পালনে

নদনদী

ডাকাতিয়া নদীর দৈর্ঘ্য-২০৭ কিলোমিটার। বাংলাদেশের কুমিল্লা, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত এই নদী। নদীটি ভারতের ত্রিপুরা পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা-লাকসাম চাঁদপুর হয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে। যা লক্ষ্মীপুরের হাজিমারা পর্যন্ত বিস্তৃত। চাঁদপুর থেকে এই ডাকাতিয়া নদী যোগ হয়েছে কুমিল্লার গোমতীর সঙ্গে ইহা ২৩০.২০ অক্ষাংশে এবং ৯১০.৩১ দ্রাঘিমা বিস্তৃত। যা বামদিকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ফেনী নদীতে মিশেছে।

পদ্মা বাংলাদেশের একটি প্রধান নদী। এটি হিমালয়ে উৎপন্ন গঙ্গানদীর প্রধান শাখা এবং বাংলাদেশের ২য় দীর্ঘতম নদী। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর রাজশাহী এই পদ্মার উত্তর তীরে অবস্থিত। পদ্মার সর্বোচ্চ গভীরতা ১,৫৭১ ফুট(৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ফুট(২৯৫ মিটার)।রাজা রাজবল্লভের কীর্তি পদ্মার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয় বলে পদ্মার আরেক নাম কীর্তিনাশা । উৎপত্তিস্থল হতে ২২০০ কিলোমিটার দূরে গোয়ালন্দে যমুনা নদীর সাথে মিলিত হয়ে মিলিত প্রবাহ পদ্মা নামে আরো পূর্ব দিকে চাঁদপুর জেলায় মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। সবশেষে পদ্মা-মেঘনার মিলিত প্রবাহ মেঘনা নাম ধারণ করে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হয়।

মেঘনা নদী বাংলাদেশ এর একটি অন্যতম প্রধান নদী। পূর্ব ভারতের পাহাড় থেকে উদ্ভূত মেঘনা নদী সিলেট অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে চাঁদপুরের কাছে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়ে মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগর এ প্রবাহিত হয়েছে।

চাঁদপুরের (chandpur) উপর দিয়ে দেশের ৯০ ভাগ নদ নদীর পানি বঙ্গপোসাগরে প্রবাহিত হয়। ফলে মেঘনা মোহনা বর্ষার এই সময়টাতে হয়ে উঠে ভয়ংকর। কারো কারো মতে এই স্থানটি আফ্রিকার বার্মুডা ট্রায়াঙ্গালের চাইতেও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে বর্ষায়। প্রতি সেকেন্ডে এখানে বর্তমানে পানির তীব্রতা ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত।

চাঁদপুর জেলার ব্যবসা বাণিজ্য

চাঁদপুর (chandpur) জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। নদী তীরবর্তী এলাকা বলে প্রায় ৩০% মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য শিল্পের সাথে জড়িত। এছাড়াও উল্লেখযোগ্যভাবে অনেক ব্যবসায়ী বিদ্যমান। জেলা সদরে অনেক মাছের আড়ত রয়েছে, যা জেলার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। চাঁদপুর শহরের বাবুরহাটে বড়বড় বহু শিল্পকারখানা রয়েছে। এই জায়গাটিকে সরকার বিসিক শিল্প নগরী ঘোষণা করে। এই এলাকাটি শুধু চাঁদপুরের নয় পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি আশীর্বাদস্বরূপ শিল্প নগরী। মেঘনার ভাঙ্গনে প্রতি বছর চাঁদপুরের আয়তন কমে গেলেও মেঘনা, চাঁদপুরের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। প্রতি বর্ষায় পানিতে ডুবে যায়, ফলে বর্ষাকালে চাঁদপুর মাছের মাতৃভূমি হয়ে যায়। জেলার প্রধান শস্য ধান, পাট, গম, আখ। রপ্তানী পণ্যের মধ্যে রয়েছে নারিকেল, চিংড়ি, আলু, ইলিশ মাছ, সবুজ শাক-সবজি, বিসিক নগরীর তৈরি পোশাক শিল্প।

নদীগর্ভে বিলিন হওয়া নরসিংহপুরে স্থাপিত হয় চাঁদপুর থানা ও অফিস আদালত। তখন পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গমস্থল ছিল বর্তমান স্থান থেকে প্রায় ৬০ মাইল দক্ষিণে। নরসিংহপুর ধীরে ধীরে নদীগর্ভে বিলিন হয়। পদ্মা, মেঘনা তীরে ধীরে ধীরে বর্তমান চাঁদপুর পত্তন হয়। চাঁদপুর ১৭৭৯ সালে রেনেলের মানচিত্রে ত্রিপুরা জেলার সঙ্গে নরসিংহপুরে চাঁদপুরের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত হয়। ১৭৭৮ সালে চাঁদপুর মহকুমায় রূপান্তরিত হয়। এর আগে থেকেই পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার সঙ্গমস্থলে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক চাঁদপুর বন্দরের সুখ্যাতি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদপুর শহরটিকে দুভাগে বিভক্ত করে ডাকাতিয়া নদী। উত্তর পাড়ে নতুনবাজার আর দক্ষিণ পাড়ে পুরাণবাজার গড়ে ওঠে। মূল পুরাণবাজার ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বহুল পরিচিত। চাঁদপুর যে একটা প্রাচীনতম ব্যবসা কেন্দ্র তা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। কারণ ইতিহাসে আছে ‘মনসা মঙ্গল’ খ্যাত বিশিষ্ট চাঁদ সওদাগর সপ্তডিঙ্গা ‘‘মধুকর’’ ভাসিয়ে এ নদী বন্দরে বাণিজ্য করতে আসতেন। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে এই চাঁদ সওদাগরের নাম অনুসারেই এই বন্দরের নামকরণ করা হয় চাঁদপুর।

প্রাচীনকাল থেকেই চাঁদপুর (chandpur) অন্যতম নদীবন্দর ও ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত। বৃটিশ শাসন আমলে পাট ব্যবসার জন্য চাঁদপুরের সুনাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অবিভক্ত বাংলার সিংহদ্বার হিসেবে চাঁদপুরের খ্যাতি ছিল সমধিক। পুরানবাজাকে কেন্দ্র করেই চাঁদপুরের ব্যবসা বাণিজ্য। বৃটিশ শাসন আমলের প্রথম থেকেই পুরাণবাজার একটি বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। পুরাণবাজারের পশ্চিমে মেঘনা ও উত্তরে ডাকাতিয়া নদী। ঐ সময় নদী পথ ছিল বাণিজ্যের একমাত্র মাধ্যম। বৃটিশ আমলে চাঁদপুর হয়ে কলিকাতা যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল। তখন চাঁদপুরকে  ‘Gate way to Eastern India’ বলা হতো। চাঁদপুর (chandpur) বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে সারা ভারতবর্ষে সুপরিচিত। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী বন্দর ও প্রসিদ্ধ ব্যবসা কেন্দ্র হিসাবে চাঁদপুর বন্দর এই উপমহাদেশের অত্যন্ত পরিচিত একটি সফল নাম। দেশের চতুর্মূখী যোগাযোগ ব্যবস্থার ধারক দেশের বিখ্যাত এ বন্দর এক সময় পূর্ব বাংলা-পশ্চিম বাংলা এবং সেভেন সিষ্টার্স নামে খ্যাত ভারত বর্ষের   বিস্তীর্ণ পাহাড়ী অঞ্চলের মধ্যে  ব্যবসায়িক যোগসূত্র ও মেলবন্ধন তৈরি করে যাচ্ছিল।  বহুকাল আগে থেকেই চাঁদপুরের রূপালি ইলিশ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এছাড়া এখানকার অন্যান্য মাছ, চিংড়ি, ব্যাঙ  ইত্যাদি সুদূর ইউরোপ ও আমেরিকা পর্যন্ত রপ্তানি হয়। চাঁদপুরের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- জুট মিল, লবণ মিল, ডাল মিল, তৈল মিল, ময়দা মিল, আটার মিল, চাউল কল, চিড়া কল, কোল্ড ষ্টোরেজ, বরফ কল, স্বয়ংক্রিয় চাউল কল, ম্যাচ ফ্যাক্টরী, সাবান ফ্যাক্টরী, সিনথেটিক রশি তৈরির কারখানা, স-মিল, ইস্পাত মিল, নেট ফ্যাক্টরী এবং আরও অনেক ছোট বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। চাঁদপুরে প্রতি মাসে প্রায় দেড় হতে দুই হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যিক লেন-দেনের সরকারী রেকর্ড রয়েছে। এখানে অনেক বিদেশী ব্যবসায়ীদের সমাগম ঘটে। নাখোদারা এবং পাকিস্তানের সেই বিখ্যাত ২২ পরিবার এবং ভারতের মারওয়ারীরা এখানে দীর্ঘদিন অত্যন্ত সুনামের সাথে ব্যবসা করেছেন। বৃটিশ শাসন আমলে চাঁদপুর পাট ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল। চাঁদপুর থেকে সরাসরি বিদেশে পাট রপ্তানি হতো। পাট ব্যবসা কেন্দ্র গুলি পুরাণবাজারে গড়ে ওঠে। শিল্পবিস্তারে মরহুম ওয়ালিউল্লাহ পাটওয়ারী, সারদা বাবু, সরোজ কুমার দাস, ইদ্রিছ মজুমদার, বজলুল গণি চৌধুরী, চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরীর নাম আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয়। মেঘনা-ধনাগোদা ও চাঁদপুর-হাইমচর সেচ প্রকল্প, এ জেলায় কৃষিপণ্য উৎপাদনেও নতুনমাত্রা এনে দিয়েছে। চাঁদপুরে রয়েছে অনেকগুলি লবণ শোধানাগার।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুরাণবাজারের ব্যবসা বাণিজ্যের আরো প্রসার ঘটে। বাজারের পরিধি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অনেক গুণ বেড়ে যায়। এ সময় কিছু উৎসাহী ব্যবসায়ীর উদ্যোগে চাঁদপুর শিল্প ও বণিক সমিতির পুনর্গঠিত হয়। সমিতির সদস্য সংখ্যাও অনেক বেড়ে যায়। চাঁদপুর শিল্প ও বণিক সমিতি শুধু একটা ব্যবসায়ী সংগঠন হিসেবেই নয়, এ সমিতি চাঁদপুরের একটি অন্যতম সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত হয়। সমিতির সভাপতি জনাব মোঃ জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিমের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বণিক সমিতি ১৯৮৫ সালে ‘‘চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রি’’ হিসাবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯১ সালে ‘এ’ ক্লাশ চেম্বারে উন্নীত হয়। তিনিই চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাষ্ট্রিকে ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং নিজে   সপ্তম বারের মত এফবিসিসিআই পরিষদের পরিচালক নির্বাচিত হন। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, পুরাণবাজারের ব্যবসায়ীরা চাঁদপুর শহরের উন্নয়নে ও সমাজ সেবায় প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। ১৯৪৬ সালে চাঁদপুর কলেজ প্রতিষ্ঠায় পুরাণবাজারের ব্যবসায়ীদের অবদান স্মরণীয়। বলা যায় পুরাণবাজারের ব্যবসায়ীরা চাঁদা তুলে এ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া চাঁদপুর মহিলা কলেজ, বি.ডি হল, টাউন হল নির্মাণেও তাঁদের অবদান রয়েছে ।

১৯৬০ সাল থেকে মেঘনার করাল গ্রাসে নতুনবাজার ও পুরাণবাজার ভাঙ্গতে শুরু করে। নদী ভাঙ্গনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরাণবাজারের ব্যবসায়ীবৃন্দ। ভাঙ্গনরোধে বণিক সমিতি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এ সমিতি ভাঙ্গনরোধ করার জন্য বার বার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দীর্ঘদিন থেকে পুরাণবাজার ব্যবসা বাণিজ্য সড়ক যোগাযোগের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চাঁদপুর-শরিয়তপুর ফেরী সার্ভিস প্রবর্তন এবং ঢাকা-পুরাণবাজার-চট্রগ্রামের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় চাঁদপুরের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন ও পুরাণবাজারের মধ্যে একটি ব্রিজ নির্মাণ করে দিয়ে চাঁদপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যের সোনালী সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।

চাঁদপুর জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা

চাঁদপুর (chandpur) জেলায় যোগাযোগের প্রধান সড়ক হল ঢাকা-চাঁদপুর মহাসড়ক এবং চট্টগ্রাম-চাঁদপুর মহাসড়ক। শুধুমাত্র চাঁদপুর জেলার জন্য আলাদা একটি রেল পথ রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিদিন চাঁদপুর-চট্টগ্রাম এবং চাঁদপুর-কুমিল্লার আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন জেলা শহর থেকে নৌপথে যোগাযোগের জন্যে রয়েছে চাঁদপুর নদী বন্দর

নদীপথে যাতায়তঃ

চাঁদপুর (chandpur) বন্দর বিভাগের নিয়ন্ত্রনাধীণ চাঁদপুর জেলায় ২৩ টি, কুমিল্লা জেলায় ০৯ টি, ব্রাহ্মণ-বাড়ীয়া জেলায় ১১ টি, শরীয়তপুর জেলায় ০৮ টি, মাদারীপুর জেলায় ০১ টি ও লক্ষীপুর জেলায় ২টি, অর্থাৎ ০৬ টি জেলায় মোট ৫৪ টি ঘাট/পয়েন্ট রয়েছে এবং ০৩ টি ফেরীঘাট রয়েছে (লক্ষীপুর জেলার মজু চৌধুরী হাট ফেরীঘাট, হরিণা ফেরীঘাট ও আলু বাজার ফেরীঘাট)। চাঁদপুর নদীবন্দর এলাকায় কর্তৃপক্ষের কর্মচারী দ্বারা সরাসরি শুল্ক আদায় করা হয়। বন্দর বিভাগের যাবতীয় কার্যাবলী ০১ জন উপ-পরিচালকের অধীনে সম্পাদন করা হচ্ছে। চাঁদপুর নদী বন্দরের কার্যক্রম নিম্নরুপঃ

ক) টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ/ঘাট/পয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণ ও উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে বাৎসরিক ভিত্তিতে ইজারা প্রদান;

খ)  চাঁদপুর নদী বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন নৌ-পথে নদী খনন/বালি উত্তোলনের অনুমতি/অনাপত্তি প্রদান;

গ) নদী বন্দর সীমানায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ;

ঘ) নদী বন্দর সীমানা/ফোরশোর ব্যবহারকারীদের নিকট থেকে ল্যান্ডিং এন্ড শিপিং চার্জ আদায়  প্রদান;

চাঁদপুর নদী বন্দরে বন্দর বিভাগ ছাড়াও বিআইডব্লিউটিএ নিয়ন্ত্রণাধীন আরও ০৪ টি বিভাগ রয়েছে। সেগুলি হচ্ছে,

(ক) নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ,

(খ) নৌ-সংরক্ষন ও পরিচালন বিভাগ,

(গ) প্রকৌশল বিভাগ,

(ঘ)  হিসাব বিভাগ।

চাঁদপুর হয়ে দক্ষিণাঞ্চলগামী নৌপথের ইতিবৃত্তঃ

চাঁদপুর (chandpur) জেলার  আওতাধীনঃ ২০৩ কিঃ মিঃ নৌপথ রয়েছে, যা দিয়ে বিপুল সংখ্যক যাত্রী ও বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়। চাঁদপুর নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ চাঁদপুর জেলার ২০৩ কিঃ মিঃ সহ মোট ৬৭৫ কিঃ মিঃ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ও নাব্যতা রক্ষা করে থাকে। চাঁদপুর নদী বন্দর হতে বিভিন্ন নৌ-পথে যাত্রীবাহী একতলা, দ্বিতলা ও ত্রিতলা লঞ্চ এবং বিআইডব্লিউটিসি’র ষ্টীমার চলাচল করে থাকে। তাছাড়া পণ্যবাহী কার্গো, বাল্কহেড, ওয়েল ট্যাংকার এবং ছোট-বড় সকল ধরনের নৌ-যান চলাচল করে ।

চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে বৎসরে আনুমানিক ১৬,৪৬,৩৩১ জন (২০১০-২০১১) যাত্রী আগমন/নির্গমন করে থাকে। চাঁদপুর বন্দর সীমানায় মালামাল বছরে উঠানামার পরিমাণ ২,৫০,০০০ মেঃ টন (প্রায়)।  চাঁদপুর নদী বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ওয়েসাইড লঞ্চঘাট/পয়েন্ট দিয়ে আগমন/নির্গমনকারী যাত্রী সাধারণের সংখ্যা প্রায় ৭২,৮৮,১১৬ জন। চাঁদপুর নদী বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ওয়েসাইড লঞ্চঘাট/পয়েন্ট দিয়ে মালামাল উঠানামার পরিমাণ বছরে মোট ৫,২০,১২১ মেঃ টন (প্রায়)।

চাঁদপুর-ঢাকা রুটে একসময় ঐতিহ্যবাহী ‘বেঙ্গল ওয়াটার’ নামে লঞ্চ সার্ভিস ছিল যা এখন আর নেই। তবে এখন বেশ ক’টি উন্নতমানের লঞ্চ প্রতিদিন ঢাকা-চাঁদপুর রুটে চলাচল করছে। এগুলির মধ্যে আব-এ-জমজম, রফ রফ, ময়ূর-১, ময়ূর-২, আল বোরাক, মেঘনা রাণী, ইমাম হাসান ইত্যাদি লঞ্চ সার্ভিসের নাম উল্লেখযোগ্য।

চাঁদপুর (chandpur) নদী বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন হরিণা-আলুবাজার ফেরী রুটটি সদ্য প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক সাহেবের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০১ সালে চালু হয়। ফেরীঘাটটি চালু করার উদ্দেশ্য হচ্ছে চট্রগ্রাম সিলেট অঞ্চলের সাথে মংলা বন্দরসহ খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের সহজ যোগাযোগ স্থাপন করা। রুটটি চালু থাকলে সড়কপথে চট্রগ্রাম থেকে মংলা যাতায়াতে ১২৮ কিঃ মিঃ পথ কম হয়। দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের লোকজন ঢাকা না গিয়েই চট্রগ্রাম অঞ্চলে যাতায়াত করতে পারেন। ফলে যাত্রীদের ৮/১০ ঘন্টা সময় বেঁচে যায়। এ জন্য বিআইডব্লিউটিএ প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয় করে হরিণায় ৬.৫০ একর এবং আলুবাজারে ৫.০০একর জমির উপর ২৮ টি সেমি পাকা স্থাপনাদি, বিশ্রামগার ও ৬ টি টয়লেট কমপ্লেক্স এবং বিশাল পার্কিং ইয়ার্ড, ফেরী পন্টুন ইত্যাদি সুবিধাদি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা সংকটের কারণে ফেরী ও নৌ-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। হরিণা-আলুবাজার ফেরী রুটে অসংখ্য ডুবোচর রয়েছে। পরিকল্পিত ড্রেজিং- এর মাধ্যমে সারা বছর নৌ-পথ সচল রাখা হলে ঘাটের গুরুত্ব ও যানবাহন  চলাচল বৃদ্ধি পাবে। হরিণা ফেরীঘাট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০ টি  যানবাহন আসা যাওয়া করে।

উজানের পানির চাপ/স্রোত না থাকায় বর্ষার শেষ দিকে নদীতে পলি পড়ে নদীর তলদেশে ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং মূল স্রোতধারা কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে নৌ-পথ সংকুচিত হয়ে আসছে। নাব্য নৌ-পথে জলযান চলাচল করার জন্য যে সকল নৌ-সহায়ক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। সেগুলি জলদস্যু/দুস্কৃতিকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং  চুরি করে নিয়ে  যায়।

নৌ-চলাচলের সহায়ক যন্ত্রপাতি যাতে জলদস্যু/দুস্কৃতিকারীরা চুরি/নষ্ট না করতে পারে এবং নৌ-পথে চলাচলরত জলযান পণ্য ও যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তার জন্য চাঁদপুরে কোষ্টগার্ডের একটি ষ্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে নৌ-বসতি বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।

চাঁদপুর বন্দর হয়ে চলাচলকারী বিআইডব্লিউটিসিএর জলযানসমূহঃ

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ বলে সাবেক IGRSN, BDRS, BGS,বঙ্গ ভে, পাক ভে, সোহাগপুর, সী-টাগ ইত্যাদি ছোট বড় ১৪ টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিআইডব্লিউটিসি জন্ম হয়। এই  প্রতিষ্ঠানে ছোট বড় মোট পাঁচ শতাধিক জলযান নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে জাহাজের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের জাহাজ বহরের মধ্যে ছিল- যাত্রীবাহী জাহাজ, মালবাহী জাহাজ, তৈলবাহী জাহাজ, উদ্ধারকারী টাগ বহর ও ফেরী বহর। অধিকাংশ জলযান এ চাঁদপুর বন্দর ঘাট হয়েই চলাচল করে। BIWTCএর যাত্রীবাহী রকেট সার্ভিস হিসেবে খ্যাত।

যাত্রীবাহী জাহাজের মধ্যে পিএস গাজী, পিএস কিউই, পিএস মোমেন্ট, পিএস সহিদ বেলায়েত, পিএস অষ্ট্রিচ, পিএস মাসুদ, পিএস লেপচা, পিএস টার্ন, এমভি সোনারগাঁও, এমভি সেলা অন্যতম। বর্তমানে পিএস অষ্ট্রিচ, পিএস মাসুদ, পিএস লেপচা, পিএস টার্ন, এমভি সোনারগাঁও এবং এমভি সেলা নামে জাহাজগুলো ঢাকা-চাঁদপুর-খুলনা রুটে চলাচল করছে।

ঢাকা-খুলনা রকেট সার্ভিস ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল-নলসিটি-ঝালকাঠি-হুলারহাট-কাউখালী-চরখালী-সন্নাসী-বড়মাছুয়া-মোড়লগঞ্জ-মংলা-খুলনা পর্যন্ত যাতায়াত করে। গোয়ালন্দ-চাঁদপুর সার্ভিস বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

চাঁদপুরের ঐতিহাসিক নিদর্শন

চাঁদপুর -এর কচুয়া, হাজীগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশ ও শাহরাস্তি উপজেলার মেহের শ্রীপুর অঞ্চলটি সবচেয়ে প্রাচীন। বাংলার সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ্ এর রাজত্বকালে (১৩৩৮-১৩৪৯) দেওয়ান ফিরুজ খান লস্কর এর খনন করা দীঘির পশ্চিম পাড়ে ৭৭৫ হিজরীতে একটি মসজিদ স্থাপন করা হয়। এ মসজিদই সম্ভবত বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার সর্ব প্রাচীন মসজিদ। এটি হাজীগঞ্জ উপজেলার সামান্য উত্তরে পিরোজপুর গ্রামে অবস্থিত। চাঁদপুর (chandpur) জেলার ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাজীগঞ্জ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। হাজী মনিরুদ্দিন শাহ (মনাই গাজী) এর হাজী দোকান এর সুখ্যাতিতে গড়ে উঠা বাজার থেকে হাজীগঞ্জ শব্দের উৎপত্তি ঘটে। জেলার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম বড় মসজিদ হাজীগঞ্জে অবস্থিত। ঐতিহাসিক এই বড় মসজিদ স্থাপিত হয় ১৩০০ বঙ্গাব্দে (১৮৯৩ খ্রি.)। হাজীগঞ্জের ৬ মাইল পশ্চিমে অলিপুর গ্রাম। এ গ্রামে দুটি প্রাচীন মসজিদ আছে। একটি শাহ সুজার আমলে নির্মিত সুজা মসজিদ। অপরটি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত আলমগীর মসজিদ নামে পরিচিত। এটি নির্মাণ করেছিলেন মোঃ আবদুল্লাহ আনুমানিক ১৩৭০ খ্রি.। আলীগঞ্জের মাদা্হ খাঁ নামক এক দরবেশের নামে ১৭৩৮ খ্রি. স্থাপিত হয় বর্তমান মাদা্হ খাঁ মসজিদ।

১৩৫১ সালে মেহের শ্রীপুর অঞ্চলে এসেছিলেন বিখ্যাত আউলিয়া হযরত রাস্তি শাহ। ১৩৮৮ খ্রি. তিনি ইন্তেকাল করেন। মেহের শ্রীপুর-এ তাঁর মাজার অবস্থিত। বিখ্যাত হিন্দু সাধক সর্বানন্দ ঠাকুর এ মেহেরেই দশ মহাবিদ্যা সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। সিদ্ধি লাভের স্থানটিতেই গড়ে উঠেছে মেহের কালবাড়ী। হযরত রাস্তি শাহ্ এর নামেই এ অঞ্চলের নাম হয় শাহরাস্তি। এটিই এখন শাহরাস্তি উপজেলা নামে পরিচিত।

চাঁদপুর (chandpur) শহরের ৬ মাইল পুর্বে শাহতলী গ্রামটি বাগদাদ থেকে আগত দরবেশ শাহ মোহাম্মদ সাহেবের নাম থেকে হয়েছে। তিনি সুলতান ফিরোজ শাহের রাজত্বকালে ধর্ম প্রচারের জন্য এ অঞ্চলে এসেছিলেন। তিনি সুলতানের নিকট থেকে নিস্কর জমি লাভ করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে চাঁদপুর মহকুমার প্রথম মঠ স্থাপিত হয়েছিল বাবুরহাটের কাছে বর্তমান মঠখোলায়। বাবুর হাট তখনও স্থাপিত হয়নি।

নাসিরকোট গ্রামটি হাজীগঞ্জ উপজেলা সদর হতে প্রায় ১০ মাইল উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সময় কচুয়া থানার আলীয়ারায় ক্ষত্রীয় রাজা অযোধ্যারাম ছেদ্দা নিজেকে স্বাধীন নরপতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা তাকে দমনের জন্য সেনাপতি নাসির খানকে প্রেরণ করেন। নাসির খান এখানে একটি দূর্গ নির্মাণ করেন। যুদ্ধে ছেদ্দা পরাজিত ও নিহত হন। কোট অর্থ দূর্গ। তাই নাসির খানের দূর্গের জন্যই এই গ্রামের নাম হয় নাসিরকোট।

১৮৮২ সালে ঢাকা নবাবদের দানে প্রতিষ্ঠিত হয় চাঁদপুর শহরের প্রথম মসজিদ বেগম মসজিদ। হাজীগঞ্জের লক্ষী নারায়ণ জিউর আখড়া স্থাপিত হয় ১৮৭৮ খ্রি.। চাঁদপুর কালীবাড়ী স্থাপিত হয় ১৮৮৩ খ্রি.। ১৮৮৫ সালে আসাম বেঙ্গল রেলপথের চাঁদপুর শাখা নির্মিত হয়। পরে আই.জি.আর.এস.এন কোম্পানীর স্টিমার ঘাট স্থাপিত হয়। বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে সারা ভারতে চাঁদপুরের পরিচিতি ছিল। এটি তখন ছিল পাট ব্যবসায়ের অন্যতম কেন্দ্র। চাঁদপুরকে এক সময় বৃটিশ ভারতের গেটওয়ে টু ইস্টার্ণ ইন্ডিয়া বলা হতো। চাঁদপুর জেলার চালিতাতলীর এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউট এ জেলার সর্ব প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

জি.পি ওয়াইজ মেঘনা তীরবর্তী শ্রীরামদী- ব্রাক্ষণচর, নাছিমপুর, ভড়ঙ্গারচর এবং আকানগর নামক স্থানগুলোতে কুঠি স্থাপন করে নীল চাষ শুরু করেছিলেন। ১৮৬৬ সনে এই নীল চাষের পূর্ণ উন্নতি সাধিত হয়েছিল। কিন্তু নীল চাষীদের দূর্বার প্রতিরোধের মুখে ১৮৭৩ সালে এ অঞ্চল থেকে নীল চাষ বন্ধ হয়ে যায়। বেশীর ভাগ নীল কুঠি এখন মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবে ফরিদগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত সাহেবগঞ্জে এখনও কিছু নীল কুঠি আছে।

মতলব উপজেলার একটি গ্রামের নাম মতলবগঞ্জ। এটি বৈরাগী বাজার নামে পূর্বে পরিচিত ছিল। প্রায় ১৫০ বছর আগে কিছু বৈরাগী এ জায়গায় বসতি স্থাপন করে এবং তখন পাশ্ববর্তী এলাকার লোকজন এলাকায় আসতে শুরু করে। পরে এ জায়গা বাজার হিসেবে গড়ে উঠে এবং বৈরাগীবাজার নাম ধারণ করে। এভাবে জায়গাটিতে বাজার সৃষ্টি হয় এবং ধনাগোদা নদীর তীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর গড়ে উঠে। প্রায় ৮০/৯০ বছর আগে পাশ্ববর্তী দীঘলদি গ্রামের জনৈক মোতালেব জমাদারের নাম অনুসারে বৈরাগী বাজারকে মতলবগঞ্জ বাজার নামকরণ করা হয়। এভাবে গড়ে উঠা মতলবগঞ্জ বাজার বর্তমানে মতলব উপজেলার উপজেলা হেড কোয়াটার্স।

চাঁদপুর জেলার দর্শনীয় স্থান

  • অঙ্গীকার স্মৃতিসৌধ ,আলমগীরী মসজিদ,ইলিশ চত্বর
  • ওনুয়া স্মৃতি ভাস্কর্য ,কড়ৈতলী জমিদার বাড়ি
  • গজরা জমিদার বাড়ি
  • গুরুর চর
  • চাঁদপুর বন্দর
  • চৌধুরী বাড়ি
  • তুলাতুলী মঠ
  • দুর্লভ জাতের নাগলিঙ্গম গাছ (জেলা প্রশাসক বাংলো)
  • নাওড়া মঠ
  • পদ্মা-মেঘনার চর
  • পর্তুগীজ দুর্গ, সাহেবগঞ্জ
  • বখতিয়ার খান মসজিদ
  • বলাখাল জমিদার বাড়ি
  • বড়কুল জমিদার বাড়ি
  • বোয়ালিয়া জমিদার বাড়ি
  • মঠখোলার মঠ
  • মনসা মুড়া
  • মত্‍স্য জাদুঘর
  • মেঘনা নদীর তীর
  • যাত্রা মুনির মঠ
  • রক্তধারা স্মৃতিসৌধ
  • রাগৈ মুঘল আমলের ৩ গম্বুজ মসজিদ
  • রামচন্দ্রপুর বড় পাটওয়ারী বাড়ী (ডাকাতিয়া নদী সংলগ্ন)
  • রূপসা জমিদার বাড়ি
  • লোহাগড় জমিদার বাড়ি
  • লোহাগড় মঠ
  • লুধুয়া জমিদার বাড়ি
  • শপথ চত্বর
  • শহীদ রাজু ভাস্কর্য
  • শাহ সুজা মসজিদ
  • শাহাবুদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ
  • শিশু পার্ক
  • সত্যরাম মজুমদারের মঠ
  • সাচার রথ
  • সাহাপুর রাজবাড়ি
  • হযরত শাহরাস্তি (রহ.) এর মাজার
  • হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ(৬ষ্ঠ বৃহত্তম)
  • শোল্লা জমিদার বাড়ি

চাঁদপুর জেলার প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

  • এম এ ওয়াদুদ, ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংঘটক
  • আব্দুল করিম পাটওয়ারী, মুক্তিযুদ্ধের সংঘটক
  • বদিউল আলম, বীর উত্তম।
  • মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বীর উত্তম।
  • সিরাজুল মওলা, বীর উত্তম।
  • সালাহউদ্দিন আহমেদ, বীর উত্তম।
  • দেলোয়ার হোসেন (বীর প্রতীক)।
  • মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, বীর প্রতীক।
  • আবদুল হাকিম (মুক্তিযোদ্ধা), বীর প্রতীক।
  • নূরুল হক (বীর প্রতীক)।
  • আবু তাহের (বীর প্রতীক)।
  • মোহাম্মদ আবদুল মমিন, বীর প্রতীক।
  • শামসুল হক (বীর প্রতীক)।
  • আবুল হোসেন (বীর প্রতীক)।
  • ফারুক আহমদ পাটোয়ারী, বীর প্রতীক।
  • মোহাম্মদ আবদুল হাকিম, বীর প্রতীক।
  • আবুল কাশেম ভূঁইয়া (বীর বিক্রম)।
  • মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ, বীর বিক্রম।
  • আবদুল হালিম (বীর বিক্রম)।
  • মোহাম্মদ বজলুল গণি পাটোয়ারী, বীর বিক্রম।
  • আবদুল জব্বার পাটোয়ারী, বীর বিক্রম।
  • আমিন উল্লাহ শেখ (বীর বিক্রম)।
  • রফিকুল ইসলাম (অধ্যাপক), একজন বাংলাদেশী লেখক এবং দেশের প্রথমনজরুল গবেষক।
  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, লেখক, চিত্র সমালোচক ও শিক্ষাবিদ।
  • হাশেম খান, বরেণ্য চিত্রশিল্পী।
  • ঢালী আল মামুন, চিত্রশিল্পী।
  • দিলদার, অভিনেতা।
  • দিলারা জামান, অভিনেত্রী।
  • সাদেক বাচ্চু(মাহবুব আহমেদ সাদেক বাচ্চু ), বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম খলঅভিনেতা।
  • কবির বকুল, গীতিকার ও সাংবাদিক।
  • এসডি রুবেল, সংগীত শিল্পী।
  • আতিকুল ইসলাম, সঙ্গীত শিল্পী।
  • ডা. বদরুন্নাহার, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত বিশিষ্ট চিকিৎসক।

চাঁদপুর জেলার কিছু ছবি 

বিঃদ্রঃ এখানে দেওয়া সকল তথ্য ইন্টারনেট এর বিভিন্ন তথ্যমূলক ওয়েবসাইট ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো তথ্যে ভুল থাকে তাহলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন এবং সঠিক তথ্য দিয়ে ভুল টা সংশোধন করার জন্য আমাদের সাহায্য করবেন এবং এই তথ্য টি পরে যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে তথ্যটি শেয়ার করবেন ।

তথ্যসূত্র:
স্থানীয় লোকজন
https://bn.wikipedia.org

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here