কুমিল্লা জেলার পরিচিতি

0
32

কুমিল্লা জেলা সম্পর্কিত বিস্তারিত বর্ণনা (comilla)

কুমিল্লা ( comilla ) ঢাকা ও চট্টগ্রাম এর পর বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর । বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত একটি মহানগর। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম বিভাগের অধীন একটি জেলা।তবে কিছুদিন পর এটি কুমিল্লা নামে নিজস্ব বিভাগ ঘোষিত হবে।

কুমিল্লা জেলার পটভূমি

এটি সমতট জনপদের অন্তর্গত ছিল এবং পরবর্তীতে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ হয়েছিল। এ অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন নিদর্শনাদি থেকে যতদূর জানা যায় খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে ত্রিপুরা গুপ্ত সম্রাটদের অধিকারভুক্ত ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে সপ্তম থেকে অষ্টম শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এ অঞ্চলে বৌদ্ধ দেববংশ রাজত্ব করে। নবম শতাব্দীতে কুমিল্লা হরিকেলের রাজাগণের শাসনাধীনে আসে। প্রত্নপ্রমাণ হতে পাওয়া যায় যে, দশম হতে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ বছর এ অঞ্চল চন্দ্র রাজবংশ দ্বারা শাসিত হয়েছে।

মধ্যবর্তী সময়ে মোঘলদের দ্বারা শাসিত হওয়ার পরে ১৭৬৫ সালে এটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে আসে। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে কোম্পানী ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ প্রদেশে একজন তত্ত্বাবধায়ক  নিয়োগ করে। তখন কুমিল্লা ঢাকা প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লাকে কালেক্টরের অধীন করা হয়। ১৭৯০ সালে ত্রিপুরা জেলা গঠনের মাধ্যমে ত্রিপুরা কালেক্টরেটের যাত্রা শুরু হয়। ১৭৯৩ সালে তৃতীয় রেগুলেশন অনুযায়ী ত্রিপুরা জেলার জন্য একজন দেওয়ানি জজ নিযুক্ত করা হয় এবং সে বছরই তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়। ১৮৩৭ সালে ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরের পদগুলিকে পৃথক করা হয়। ১৮৫৯ সালে আবার এই দুটি পদকে একত্রিত করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরবর্তী সময়ে ১৯৬০ সালে ত্রিপুরা জেলার নামকরণ করা হয় কুমিল্লা এবং তখন থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর পদটির নামকরণ হয় ডেপুটি কমিশনার। ১৯৮৪ সালে কুমিল্লার দু’টি মহকুমা চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে পৃথক জেলা হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়।

কুমিল্লা জেলার তথ্যাবলী       

কুমিল্লা জেলা  (comilla) ২৩°০১’ থেকে ২৩°৪৭’ ৩৬” উত্তর অক্ষাংশে এবং ৯০°৩৯’ থেকে ৯১°২২’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে বিস্তৃত। কর্কটক্রান্তি রেখা কুমিল্লা জেলা অতিক্রম করেছে।

সীমানাঃ উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, দক্ষিণে ফেনী ও নোয়াখালী জেলা, পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা, পশ্চিমে চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলা।

আয়তনঃ ৩০৮৭.৩৩ বর্গ কিলোমিটার।

আন্তর্জাতিক সীমান্ত দৈর্ঘ্যঃ ১০৬ কিলোমিটার

প্রশাসনিক কাঠামো

উপজেলাঃ ১৭ টি (আদর্শ সদর, কুমিল্লা  (comilla) সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, বরুড়া, নাংগলকোট, মনোহরগঞ্জ, চান্দিনা, তিতাস, দাউদকান্দি, হোমনা, মেঘনা, মুরাদনগর, দেবিদ্বার, বুড়িচং ,ব্রাহ্মণপাড়া ও লালমাই )

সংসদীয় আসন সংখ্যা : ১১ টি

সিটি কর্পোরেশন : ০১ টি (কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন), প্রতিষ্ঠাকাল ১০/০৭/২০১১খ্রিঃ

আয়তনঃ ৫৩.০৪ বঃ কিঃ মিঃ

ওয়ার্ডঃ ২৭টি

জনসংখ্যাঃ ৩,৩৯,১৩৩ জন(পুরুষ:১,৭৭,৩০০ জন ও মহিলা:১,৬১,৮৩৩ জন)(২০১১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী)

পৌরসভা : ০৮ টি

ইউনিয়নঃ ১৮৫ টি

গ্রামঃ৩,৬৮৭ টি

জোতঃ ৫,৩৪,৩০৭ টি

মৌজাঃ ২,৭১৭ টি

ইউনিয়ন ভূমি অফিসঃ ১৭২ টি

comilla

কুমিল্লা জেলার অভ্যন্তরীণ মানচিত্র

কুমিল্লা জেলার ইউনিয়নের তালিকা

মেট্রোপলিটন এলাকার আয়তন ১৫৩ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ২৩ লাখ। এটি ্কিতবস্থিত কুমিল্লা জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু।

আর্দশ সদর উপজেলা :
কালীরবাজার ইউনিয়ন,দূর্গাপুর(উত্তর)  ইউনিয়ন,দুর্গাপুর(দক্ষিণ) ইউনিয়ন,আমড়াতলী ইউনিয়ন, পাঁচথুবী ইউনিয়ন,জগন্নাথপুর ইউনিয়ন, কালীরবাজার ইউনিয়ন,দূর্গাপুর(উত্তর)  ইউনিয়ন ,দুর্গাপুর(দক্ষিণ) ইউনিয়ন,আমড়াতলী ইউনিয়ন, পাঁচথুবী ইউনিয়ন,জগন্নাথপুর ইউনিয়ন

দেবিদ্বার উপজেলা  :
সুবিল ইউনিয়ন, রসুলপুর ইউনিয়ন, গুনাইঘর (উত্তর) ইউনিয়ন, গুনাইঘর (দক্ষিণ) ইউনিয়ন,বড়শালঘর ইউনিয়ন, রাজামেহার ইউনিয়ন,ইউসুফপুর ইউনিয়ন ,মোহনপুর ইউনিয়ন,ভানী ইউনিয়ন,ফতেহাবাদ ইউনিয়ন ,জাফরগঞ্জ ইউনিয়ন,ধামতী ইউনিয়ন ,বরকামতা ইউনিয়ন,সুলতানপুর ইউনিয়ন ,এলাহাবাদ ইউনিয়ন

হোমনা উপজেলা:
মাথাভাঙ্গা ইউনিয়ন,ঘাগুটিয়া ইউনিযন ,আছাদপুর ইউনিয়ন,চান্দেরচর ইউনিয়ন,ভাষানিয়া ইউনিয়ন,নিলখী ইউনিয়ন, ঘারমোড়া ইউনিয়ন,জয়পুর ইউনিয়ন ,দুলালপুর ইউনিয়ন

সদর দক্ষিন উপজেলা:
জোড়কানন (পুর্ব) ইউনিয়ন,জোড়কানন (পশ্চিম) ইউনিয়ন,চৌয়ারা ইউনিয়ন,বারপাড়া ইউনিয়ন, গলিয়ারা ইউনিয়ন,বাগমারা (উত্তর) ইউনিয়ন,বাগমারা (দক্ষিন) ইউনিয়ন, ভূলইন (উত্তর) ইউনিয়ন, ভূলইন (দক্ষিন) ইউনিয়ন,বেলঘর (উত্তর) ইউনিয়ন,বেলঘর (দক্ষিন) ইউনিয়ন,পেরুল (উত্তর) ইউনিয়ন,পেরুল (দক্ষিন) ইউনিয়ন,বিজয়পুর ইউনিয়ন

বরুড়া উপজেলা
আগানগর ইউনিয়ন,ভবানীপুর ইউনিয়ন,খোশবাস (উ:) ইউনিয়ন,ঝলম ইউনিয়ন,চিতড্ডা ইউনিয়ন,শিলমুড়ি (দ:) ইউনিয়ন,শিলমুড়ি (উ:) ইউনিয়ন,গালিমপুর ইউনিয়ন,শাকপুর ইউনিয়ন,ভাউকসার ইউনিয়ন,চান্দলা ইউনিয়ন, আড্ডা ইউনিয়ন,আদ্রা ইউনিয়ন

দাউদকান্দি উপজেলা
দৌলতপুর ইউনিয়ন,দাউদকান্দি(উত্তর) ইউনিয়ন,ইলেটগঞ্জ (উত্তর) ইউনিয়ন,ইলেটগঞ্জ (দক্ষিন) ইউনিয়ন,জিংলাতলী ইউনিয়ন,সুন্দলপুর ইউনিয়ন,গৌরিপুর ইউনিয়ন,মোহাম্মদপুর (পূব) ইউনিয়ন,মোহম্মদপুর(পশ্চিম) ইউনিয়ন,গোয়ালমারী ইউনিয়ন,মারুকা ইউনিয়ন,বিটেশ্বর ইউনিয়ন,পদুয়া ইউনিয়ন,পাঁচগাছিয়া(পশ্চিম) ইউনিয়ন,বারপাড়া ইউনিয়ন

ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা
শিদলাই ইউনিয়ন ,চান্দলা ইউনিয়ন, শশীদল ইউনিয়ন ,দুলালপুর (২) ইউনিয়ন ,ব্রাহ্মনপাড়া সদর ইউনিয়ন ,সাহেবাবাদ ইউনিয়ন ,মালাপাড়া ইউনিয়ন, মাধবপুর ইউনিয়ন

বুড়িচং উপজেলা
ময়নামতি ইউনিয়ন,ভারেল্লা ইউনিয়ন,মোকাম ইউনিয়ন,বুড়িচং সদর ইউনিয়ন,বাকশীমূল ইউনিয়ন,পীরযাত্রাপুর ইউনিয়ন,ষোলনল ইউনিয়ন,রাজাপুর ইউনিয়ন,

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা
শ্রীপুর ইউনিয়ন,কাশিনগর ইউনিয়ন,কালিকাপুর ইউনিয়ন, শুভপুর ইউনিয়ন, ঘোলপাশা ইউনিয়ন,মুন্সীরহাট ইউনিয়ন,বাতিসা ইউনিয়ন,কনকাপৈত ইউনিয়ন,চিওড়া ইউনিয়ন,জগন্নাথদিঘী ইউনিয়ন,গুনবতী ইউনিয়ন,আলকরা ইউনিয়ন,উজিরপুর ইউনিয়ন

মুরাদনগর উপজেলা
১নং শ্রীকাইল ইউনিয়ন,৩নং আন্দিকোট ইউনিয়ন,২নং আকুবপুর ইউনিয়ন,৪নং পুর্বধৈইর (পুর্ব) ইউনিয়ন,৫নং পুর্বধৈইর (পশ্চিম) ইউনিয়ন,৬নং বাঙ্গরা (পূর্ব) ইউনিয়ন,৫নং পুর্বধৈইর (পশ্চিম) ইউনিয়ন,৮নং চাপিতলা ইউনিয়ন,৯নং কামাল্লা ইউনিয়ন,১০নং যাত্রাপুর ইউনিয়ন,রামচন্দ্রপুর উত্তর ইউনিয়ন,রামচন্দ্রপুর দক্ষিন ইউনিয়ন,১৩ নং মুরাদনগর সদর ইউনিয়ন,১২নং নবীপুর (পুর্ব) ইউনিয়ন,১৪নং ধামঘর ইউনিয়ন,১৫নং জাহাপুর ইউনিয়ন,১৩নং নবীপুর (পশ্চিম) ইউনিয়ন,১৬নং ছালিয়াকান্দি ইউনিয়ন,১৭নং দারোরা ইউনিয়ন,১৮নং পাহাড়পুর ইউনিয়ন,২১নং বাবুটিপাড়া ইউনিয়ন,২২নং টনকী ইউনিয়ন

মনোহরগঞ্জ উপজেলা
বাইশগাঁও ইউনিয়ন,সরসপুর ইউনিয়ন,হাসনাবাদ ইউনিয়ন,ঝলম উত্তর ইউনিয়ন ,ঝলম দক্ষিন ইউনিয়ন,মৈশাতুয়া ইউনিয়ন,লক্ষনপুর ইউনিয়ন,উত্তর হাওলা ইউনিয়ন,নাথেরপেটুয়া ইউনিয়ন,বিপুলাসার ইউনিয়ন

লাকসাম উপজেলা 

বাকই  ইউনিয়ন,মুদাফফর গঞ্জ ইউনিয়ন ,কান্দিরপাড় ইউনিয়ন,গোবিন্দপুর ইউনিয়ন (2) ,উত্তরদা ইউনিয়ন ,লাকসাম পুর্ব ইউনিয়ন,আজগরা ইউনিয়ন

নাঙ্গলকোট উপজেলা
বাঙ্গড্ডা ইউনিয়ন,পেরিয়া ইউনিয়ন,রায়কোট ইউনিয়ন,মোকরা ইউনিয়ন,মক্রবপুর ইউনিয়ন,হেসাখাল ইউনিয়ন,আদ্রা ইউনিয়ন,জোড্ডা ইউনিয়ন,ঢালুয়া ইউনিয়ন,দৌলখাঁড় ইউনিয়ন,বক্সগঞ্জ ইউনিয়ন,সাতবাড়ীয়া ইউনিয়ন

তিতাস উপজেলা
সাতানী ইউনিয়ন,জগতপুর ইউনিয়ন,বলরামপুর ইউনিয়ন,কড়িকান্দি ইউনিয়ন,কলাকান্দি ইউনিয়ন,ভিটিকান্দি ইউনিয়ন,নারান্দিয়া ইউনিয়ন,জিয়ারকান্দি ইউনিয়ন,মজিদপুর ই্উনিয়ন

চান্দিনা উপজেলা
সুহিলপুর ইউনিয়ন, বাতাঘাসি ইউনিয়ন, জোয়াগ ইউনিয়ন, বরকরই ইউনিয়ন,মাধাইয়া ইউনিয়ন,দোল্লাই নবাবপুর ইউনিয়ন,মহিচাইল ইউনিয়ন,গল্লাই ইউনিয়ন, কেরণখাল ইউনিয়ন, মাইজখার ইউনিয়ন, এতবারপুর ইউনিয়ন, বাড়েরা ইউনিয়ন, বরকইট ইউনিয়ন

মেঘনা উপজেলা
মানিকারচর ইউনিয়ন,চন্দনপুর ইউনিয়ন,চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন,গোবিন্দপুর ইউনিয়ন,বড়কান্দা ইউনিয়ন,রাধানাগর ইউনিয়ন,লুটেরচর ইউনিয়ন,ভাওরখোলা ইউনিয়ন

লালমাই উপজেলা

কুমিল্লা জেলার ভাষা সংস্কৃতি

কুমিল্লা (comilla) জেলার ভূ-প্রকৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান এই জেলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত এই জেলাকে ঘিরে রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, ঢাকা বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিভাগের অন্যান্য জেলাসমূহ। এখানে ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতই, তবুও কিছুটা বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন কথ্য ভাষায় মহাপ্রাণ ধ্বনি অনেকাংশে অনুপস্থিত, অর্থাৎ ভাষা সহজীকরণের প্রবণতা রয়েছে। কুমিল্লার দাউদকান্দি, তিতাস, মেঘনা, হোমনা প্রভৃতি উপজেলার আঞ্চলিক ভাষার সাথে সন্নিহিত ঢাকা অঞ্চলের ভাষার, চৌদ্দগ্রাম ও লাকসাম উপজেলার আঞ্চলিক ভাষায় নোয়াখালি এলাকার ভাষার অনেকটাই সাযুজ্য রয়েছে। মেঘনা-গোমতী নদীর গতিপ্রকৃতি এবং লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে কুমিল্লার মানুষের আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

এই এলাকার ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে কুমিল্লার (comilla) সভ্যতা বহু প্রাচীন। এই এলাকায় প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন সভ্যতার বাহক হিসেবে দে্দ্বীপ্যমান। এছাড়াও এ এলাকায় কিছু ক্ষুদ্র জাতিসত্বা বসবাস করে যাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে কুমিল্লার অবদানও অনস্বীকার্য। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, ওস্তাদ আয়েত আলী খান, ওস্তাদ আকবর আলী খান প্রমুখ ভুবন বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ স্মৃতি বিজড়িত কুমিল্লা। কুমিল্লার ওস্তাদ আফতাবউদ্দিন খান সরোদের মত দেখতে সুর সংগ্রহ যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। এছাড়াও তিনি মেঘ ডাবুর যন্ত্র নামে সুরযন্ত্রের স্রষ্টা। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান চন্দ্র সারং এবং ওস্তাদ আয়েত আলি খান আধুনিক সরোদ উদ্ভাবন করেন। কুমিল্লার বাঁশের বাঁশি সমগ্র উপমহাদেশে প্রসিদ্ধ।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সৃষ্ট রাগ সঙ্গীত, হেমমত্ম দুর্গেশ্বরী, মেঘ বাহার, প্রভাতকেলী, হেম বেহাগ, মদন মঞ্জরী রাগ এবং ওস্তাদ আয়েত আলী খান সৃষ্ট মিশ্র রাগ উপ মহাদেশের শাস্ত্রীয় গীতধারায় এখনও প্রবল প্রভাব রেখে চলেছে। ওস্তাদ আলী আকবর খান ১০টি নুতন রাগ সৃষ্টি করেন। এগুলো হলো রাগ চন্দ্রনন্দন, গুরুমঞ্জরী, লাজবন্তি, মিশ্র শিবরঞ্জনী, ভুপমন্দ, মেধাবী, আলমগীরি, মলয়ালম স্মৃতি, কুশিযোগি এবং রাগ চৌরাঙ্গ কল্যাণ।

যেসব সরকারী সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা কুমিল্লায় কাজ করছে সেগুলো হলোঃ

* জেলা শিল্পকলা একাডেমী, কুমিল্লা

* বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, কুমিল্লা জেলা শাখা

* সরকারী গণ গ্রন্থাগার, জজকোর্ট রোড, কুমিল্লা

* স্থানীয় সরকার ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুদানপ্রাপ্ত সংস্থা বীরচন্দ্রনগর মিলনায়তন    (টাউনহল)

* নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র, কুমিল্লা

কুমিল্লা জেলার ঐতিহ্য

কুমিল্লার খাদি

প্রাচীনকাল থেকে এই উপ-মহাদেশে হস্তচালিত তাঁত শিল্প ছিল জগদ্বিখ্যাত। দেশের চাহিদা মিটিয়ে সব সময় এই তাঁতের কাপড় বিদেশেও রপ্তানি হতো। একটি পেশাজীবী সম্প্রদায় তাঁত শিল্পের সাথে তখন জড়িত ছিলেন। তাদেরকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ‘যুগী’ বা ‘দেবনাথ’। বৃটিশ ভারতে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের সময়কালে ঐতিহাসিক কারণে এ অঞ্চলে খাদি শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তখন খাদি কাপড় তৈরি হতো রাঙ্গামাটির তূলা থেকে। জেলার চান্দিনা, দেবিদ্বার, বুড়িচং ও সদর থানায় সে সময় বাস করতো প্রচুর যুগী বা দেবনাথ পরিবার। বিদেশি বস্ত্র বর্জনে গান্ধীজীর আহ্বানে সে সময় কুমিল্লায় (comilla) ব্যাপক সাড়া জাগে এবং খাদি বস্ত্র উৎপাদনও বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে কুমিল্লার খাদি বস্ত্র। এই বস্ত্র জনপ্রিয়তা অর্জন করে কুমিল্লার খাদি হিসাবে।

গান্ধীজী প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লার অভয় আশ্রম খাদি শিল্প প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনুশীলন চক্রের আশ্রয় স্থল হিসেবে ছদ্ম বরণে প্রতিষ্ঠিত সমাজ কল্যাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভয় আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদেশি কাপড় বর্জনের ডাকে যখন ব্যাপক হারে চরকায় সূতা কাটা শুরু হয়। অভয় আশ্রম তখন সুলভে আশ্রমে তৈরি চরকা বাজারে বিক্রির পাশাপাশি নিজেরাও তৈরি করতে থাকে খাদি বস্ত্র। বিভিন্ন গ্রামে তৈরি খাদি বস্ত্রও এ সময় অভয় আশ্রমের মাধ্যমে বাজারজাত করতে শুরু করে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯২৬-২৭ সালে একটি ৮ হাত লম্বা ধুতি বিক্রি হতো মাত্র পাঁচশিকে দামে। সে সময় কুমিল্লা (comilla) অভয় আশ্রম প্রায় ৯ লাখ টাকা মূল্যের খাদি কাপড় বিক্রি করেছিল। প্রয়াত রবীন্দ্র সংগীত বিশারদ, অভয় আশ্রমের একজন কর্মী পরিমল দত্তের লেখা থেকে জানা যায়, বিপুল চাহিদা থাকলেও অভয় আশ্রম থেকে সে চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ হতো না।

খাদির দ্রুত চাহিদার কারণে দ্রুত তাঁত চালানোর জন্য পায়ে চালিত প্যাডেলের নীচে মাটিতে গর্ত করা হতো। এই গর্ত বা খাদ থেকে যে কাপড় উৎপন্ন হতো সেই কাপড় খাদি। এভাবে খাদি নামের উৎপত্তি। ক্রমান্বয়ে এই কাপড় খাদি বা খদ্দর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।স্বাধীনতা পরবর্তী সময় খাদি শিল্পের ছিল স্বর্ণযুগ। এর পরপরই আসে সংকটকাল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বস্ত্রকলগুলো তখন বন্ধ। বস্ত্র চাহিদা মেটাতে আমদানি নির্ভর দেশে হস্তচালিত তাঁতের কাপড়ের উপর প্রচুর চাপ পড়ে। দেশের বা মানুষের চাহিদার তুলনায় খাদির উৎপাদন ব্যাপক না হলেও চান্দিনা বাজারকে কেন্দ্র করে আশ-পাশের গ্রামগুলোতে তাঁতীরা চাদর, পর্দার কাপড়, পরার কাপড় তৈরি করতে শুরু করে। স্বাধীনতার পূর্বে খাদির চাহিদা শীত বস্ত্র হিসেবে ব্যাপক ছিল। খাদি বস্ত্রের চাহিদের সুযোগে এ অঞ্চলের কতিপয় অতীত সরকারের দেয়া সুতা, রং এর লাইসেন্স গ্রহণের সুবাধে মুনাফা লুটে মধ্যস্বত্ব ভোগী হিসেবে। সুলভ মূল্যে সুতা ও রংয়ের অভাবে প্রকৃত তাঁতীরা সে সময় তাদের মূল পেশা বদল করতে বাধ্য হন । আশির দশকের মাঝামাঝি দেশে ব্যাপক হারে পাওয়ার লুম ভিত্তিক বস্ত্র শিল্প গড়ে উঠে। ফলে অতুলা জাত বস্ত্রের প্রসার ব্যাপক হারে ঘটে। বেড়ে যায় পলিয়েস্টার, রেয়ন, ভিসকম এ্যাক্রেলিক সুতার ব্যবহার। রপ্তানি মুখী তৈরি পোশাকের জন্য আমদানি হতে থাকে শুল্ক মুক্ত বিদেশি বস্ত্র। এভাবে খাদ থেকে খাদি নামের যে বস্ত্রের প্রসার ঘটেছিল তা হারিয়ে যায় বিলুপ্তির খাদে।

কুমিল্লার (comilla) খাদি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও এই শিল্প মূলত কুটির শিল্প। গ্রাম্য বধূরা গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে ফাঁকে চরকায় সুতা কেটে তাঁতীদের কাছে বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেত। যে বৃদ্ধ লোকটি খেতে খামারে পরিশ্রম করতে পারত না, যে কিশোর- কিশোরী বাইরে শ্রম বিক্রির সুযোগ পেত না তারাও চরকায় সুতা কেটে সংসারে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেত।

কুমিল্লার রসমালাই

উনিশ শতকে ত্রিপুরার ঘোষ সম্প্রদায়ের হাত ধরে রস মালাইএর প্রচলন হয়। সে সময় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মিষ্টি সরবরাহের কাজটা মূলত তাদের হাতেই হত। মালাইকারির প্রলেপ দেয়া রসগোল্লা তৈরি হত সে সময়। পরে দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি ক্ষীরের মধ্যে ডোবানো রসগোল্লার প্রচলন হয়। ধীরে ধীরে সেই ক্ষীর রসগোল্লা ছোট হয়ে আজকের রসমালাই এ পরিণত হয়েছে ।

কুমিল্লার মৃৎশিল্প

বাংলার লোকশিল্পের আবহমান সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম কুমিল্লার মৃৎশিল্পের বিভিন্ন পণ্য । প্রাচীনকাল থেকেই কুমিল্লায় তৈরীকৃত গৃহস্থালি তৈজসের মধ্যে কলসি, হাঁড়ি, জালা, সরাই বা ঢাকনা, শানকি, থালা, কাপ, বদনা, ধূপদানি, মাটি নির্মিত নানা খেলনা এবং ফল, পশু-পাখি ইত্যাদি বিখ্যাত ছিল । তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তা ক্রমশ ম্রিয়মাণ হতে থাকলে ১৯৬১ সালে ডঃ আখতার হামিদ খান বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী এটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭৫ হাজার টাকা অনুদান দিলে সমিতিটি আবার ঘুরে দাড়ায়। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে সমবায় মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় এখানে গড়ে তোলা হয়েছে  – মৃৎ-শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখানে বছরের বিভিন্ন সময়ে ২০জন করে বেশ কয়েকটি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এক পক্ষ কালব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে একেকজন কুমার হয়ে উঠেন একেকজন দক্ষ শিল্পী।

বর্তমানে কুমোরেরা বিভিন্ন শোপিস এর পাশাপাশি ফুলের টব, বিভিন্ন ধরনের মুর্তি, সিরামিকস কালার, দীর্ঘস্থায়ী সেনেটারী লেট্রিনের চাক, পানির ট্যাংকি ,টাইলস ইত্যাদি তৈরী করছেন।

কুমিল্লা জেলার পুরাকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা

 শালবন বিহার

গ্রাম-শালমানপুর, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, জেলা- কুমিল্লা (comilla)

কুমিল্লা শহর থেকে ৯ কিমি. পশ্চিমে লালমাই ময়নামতি নামক অনুচ্চ গিরি শ্রেণীর পাদদেশে অবস্থিত। বর্গাকার এই বৌদ্ধ বিহারের প্রতি বাহুর পরিমাপ ১৬৭.৬৪ মিঃ। বিহারের ৪টি বাহুতে সর্বমোট ১১৫ টি ভিক্ষু কক্ষ ছাড়াও বিহারাঙ্গনে রয়েছে ক্রুশাকার কেন্দ্রিয় মন্দির। এটিকে শেষ নির্মাণ যুগে আয়তাকার মন্দিরে রুপান্তর করা হয়। মন্দিরের দেয়াল পোড়ামাটির ফলক চিত্র দ্বারা অলংকৃত ছিল। প্রত্মতাত্ত্বিক খননে এ প্রত্মকেন্দ্রে ৬টি নির্মাণ যুগের সন্ধান পাওয়া যায় এবং ১ম নির্মাণ যুগ ৬ষ্ঠ শতক এবং শেষ নির্মাণ যুগ ১২শ শতক বলে প্রত্মতাত্ত্বিকগন মনে করেন। বিহারের উত্তর বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে বিহারের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য ১টি মাত্র প্রবেশ পথ এবং প্রবেশ পথের বাইরে উত্তর পশ্চিম পাশে আরও ১ টি ছোট আকারের মন্দির পরিলক্ষিত হয় যা বিহারের সমসাময়িক কালে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়।

রুপবান মুড়া

লালমাই পাহাড়, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, জেলা-কুমিল্লা (comilla)

কুমিল্লা শহর হতে ৮ কিমি. পশ্চিমে লালমাই-ময়নামতি পাহাড় শ্রেণীর মধ্যবর্তী এবং কুমিল্লা কালির বাজার সড়কের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঢিবিটি সম্প্রতিকালে প্রত্মতাত্ত্বিক খনন পরিচালনা করে ৩৪.১৪ মি. X ২৫ মি. পরিমাপের ১ টি বৌদ্ধ বিহার ও ২৮.৯৬ মি. X২৮.৯৬ মি. পরিমাপের ক্রুশাকার মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচন করা হয়েছে। মন্দিরের পূর্ব পার্শ্বস্থ প্রকৌষ্ঠ থেকে বেলে পাথরের অভয় মুদ্রায় দন্ডায়মান বৃহদাকার ১ টি বৌদ্ধ  মূর্তি পাওয়া যায়। খননে প্রাপ্ত স্থাপত্য নিদর্শন ও প্রত্ম সম্পদ বিশ্লেষণে এই প্রত্মকেন্দ্রের সময়কাল পন্ডিতগণ খ্রী. ৭ম থেকে ১২শ শতাব্দী বলে অনুমান করেন।

ইটাখোলা মুড়া

লালমাই পাহাড় সেনানিবাস এলাকা, কুমিল্লা সদর, জেলা-কুমিল্লা (comilla)

রুপবান মুড়া প্রত্মকেন্দ্রের উত্তর পাশে অবস্থিত আরও ১ টি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ প্রত্মকেন্দ্র স্থানীয়ভাবে ইটাখোলা মুড়া নামে পরিচিত। এই স্থানে সম্প্রতি খনন পরিচালনা করে ৩৯.৬২ মি. X৩৯.৬২ মি. পরিমাপের ১টি বৌদ্ধ বিহার, ৬০.৬৬ মি. X২৫ মি. পরিমাপের ১টি আয়তাকার মন্দির এবং বেশ কয়েকটি স্তুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। উন্মোচিত মন্দিরটিতে মোট ৫টি নির্মাণ যুগের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়।

ভোজ রাজার বাড়ী

ময়নামতি পাহাড় সেনানিবাস এলাকা, কুমিল্লা সদর, জেলা-কুমিল্লা (comilla)

এই প্রত্মকেন্দ্রটি কুমিল্লা শহর হতে ৮ কিমি. পশ্চিমে কোটবাড়ী-টিপরা বাজার ক্যান্টনমেন্ট সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এটি ভোজ রাজার বাড়ী নামে পরিচিত। সম্প্রতি খননের ফলে ১টি বৌদ্ধ বিহারের আংশিক কাঠামো আবিষ্কৃত হয়েছে। বিহারটি বাহ্যিক পরিমাপ ১৭৩.৪৩ মি. X১৭৩.৪৩ মি. এর দক্ষিণ বাহু সম্পুর্ণ খননের ফলে দু’প্রান্তে দুটি কক্ষ ছাড়াও ৩১ টি কক্ষ উন্মোচিত হয়েছে। ফলে সিড়ি কক্ষ ছাড়া বিহারে ১২৪ টি কক্ষ আছে বলে অনুমিত হয়। বিহারের উত্তর বাহুর মধ্যভাগে মুল ফটকটির আংশিক নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে এবং এর কেন্দ্রস্থলে প্রদক্ষিণ পথ সহ ১টি ক্রশাকার চর্তুমুখী মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে। ক্রুশাকার মন্দিরটির পরিমাপ ৪৬.৩৩ X৪৬.৩৩ মি.। এই প্রত্মস্থানে খননের ফলে কেন্দ্রীয় মন্দির হতে ১টি ব্রোঞ্জের বৃহদাকার বুদ্ধ মুর্তি, ২টি স্থানীয় নরম পাথরে তৈরী বুদ্ধ মূর্তি এবং ১টি রৌপ্য মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া অনেকগুলো পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত খননের ফলে মোট ৪টি নির্মাণ যুগের নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। আবিষ্কৃত স্থাপত্য কাঠামো এবং প্রত্মসম্পদের বিবেচনায় এ নিদর্শনটির সময়কাল ৮ম হতে ১২শ শতাব্দী নিরুপন করা যেতে পারে।

আনন্দ বিহার

কুমিল্লা শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম এবং লালমাই ময়নামতি পাহাড়ের পূর্ব প্রান্ত ঘেঁষে অপেক্ষাকৃত নিচু ও সমতল  ভূমিতে আনন্দ বিহার প্রত্নস্থলটি অবস্থিত। ১৯৭৫ খ্রি: থেকে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ শুরু করা হয়। আয়তনে এ বিহার শালবন বিহার থেকে অনেক বড়। বর্গাকারে নির্মিত এ বিহারের প্রত্যেক বাহুর দৈঘ্য ৬২৫ ফুট। প্রতি বাহুুতে বৌদ্ধ ভিক্ষু কক্ষ উম্মোচিত হয়েছে। বিহারের মধ্যবর্তী স্থানে ক্রুশাকার কেন্দ্রীয় মন্দির উম্মোচিত হয়েছে। খননের ফলে এখানে বৃহদাকার একটি ব্রোঞ্জের মূর্তিসহ বিভিন্ন ধরণের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্ত্ত আবিষ্কৃত হয়েছে।

কোটিলা মুড়া

কুমিল্লা (comilla) সদর থেকে ৮ কিমি. এবং আনন্দ বিহার থেকে ১ কিমি. উত্তরে ময়নামতি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলটি অবস্থিত। খননের ফলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা ৩টি স্তূপের নির্দশন উন্মোচিত হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের ত্রি-রত্ন (বৌদ্ধ,ধর্ম ও সংঘ) ৩টি স্তূপ বাংলাদেশে আর কোথায়ও পাওয়া যায়নি।  প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন। ত্রি-রত্ন স্তূপের সাথে লাগোয়া পশ্চিম পাশে আরও ৯টি স্তূপ এবং পূর্ব পাশে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি ৩টি হলঘরের নির্দশন পাওয়া যায়। এগুলোর সময়কালকে খ্রিষ্টিয় সাত-তের শতক বলে অনুমান করা হয়।

চারপত্র মুড়া

কোটিলা মুড়া থেকে প্রায় ২ কিমি. উত্তর-পশ্চিমে সেনানিবাস এলাকায় একটি উঁচু সমতল পাহাড়ের চুড়ায় এই নির্দশনটি অবস্থিত। এখানে খনন করে ছোট আকৃতির মন্দিরের ধবংসাবশেষ উন্মোচিত হয়েছে এবং তিনটি নির্মাণ যুগের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। এ স্থাপত্য নিদর্শনটি  নামকরণের যথার্থতা রয়েছে। খননের ফলে এখানে ৪টি তাম্রলিপি পাওয়া গিয়েছে বিধায় ঢিবিটি চারপত্র মুড়া নামে অভিহিত করা হয়েছে। স্থাপত্য শৈলী অনুযায়ী এর সময়কালকে খ্রিঃ এগার-বার শতকে ন্যস্ত করা যায়।

রাণী ময়নামতি প্রাসাদ ও মন্দির

এই প্রত্নকেন্দ্রটি লালমাই ময়নামতি পাহাড় শ্রেণীর সর্ব উত্তর প্রান্তে বিচ্ছিন্ন একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। সমতল ভূমি হতে এর উচ্চতা ১৫.২৪মি.। স্থাণীয়ভাবে এটি রাণী ময়নামতি প্রাসাদ নামে পরিচিত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বৌদ্ধ ধর্মীয় ক্রুশাকার মন্দির সহ ৪টি নির্মাণ যুগের স্থাপত্য নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে এবং এখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ আবিস্কৃত হয়েছে। স্থাপত্য বৈশিষ্ট ও প্রত্নসম্পদের বিশ্লেষণে এটিকে ৮ম থেকে ১২শ শতাব্দীর প্রাচীন কীর্তি বলে অনুমিত হয়।

রাণীর কুঠি

রাণীর কুঠি কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগরের উত্তর পারে ছোটরা মৌজায় অবস্থিত। এটি তদানিন্তন মহারাজা মানিক্য কিশোর বাহাদুরের স্ত্রী বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। শতাধিক বছরের পুরাতন এই বাড়িটির নাম ‘‘রাণীর কুঠি’’ হিসেবে তদানিন্তন ত্রিপুরা রাজ্য সহ বাংলাদেশের সকল জেলায় সর্ব সাধারনের নিকট পরিচিত। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ এপ্রিল প্রত্নসম্পদ আইন ১৯৬৮ এর ১০ ধারার (১) উপধারার ক্ষমতা বলে রাণীর কুঠিকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সতর রত্ন মন্দির

কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পূর্ব দিকে  জগন্নাথপুর গ্রামে এ মন্দিরটি অবস্থিত। ত্রিপুরার  মহারাজা দ্বিতীয় রত্ন  মানিক্য ১৭ শতকে  মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শুরু  করেন এবং ১৮ শতকে  মহারাজা কৃষ্ণ মানিক্য সমাপ্ত  করেন। তিন তলা এবং ১৭টি রত্ন বিশিষ্ট এ মন্দিরটি অষ্টকোণাকার ভিত্তি ভূমির উপর স্থাপিত। এর প্রতি বাহুর পরিমাপ ৭.০১ মি.। এর ভিতর গাত্রে আস্তর করা এবং দেয়ালে চিত্র দ্বারা সজ্জিত আছে।

কুমিল্লা জেলার দর্শনীয় স্থান

  • শালবন বৌদ্ধ বিহার
  • ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি
  • বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড)
  • শাহ সুজা মসজিদ
  • বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন
  • উটখাড়া মাজার
  • বায়তুল আজগর জামে মসজিদ
  • নূর মানিকচর জামে মসজিদ
  • কবি তীর্থ দৌলতপুর (জাতীয় কবি কাজী নজরুলের
  • স্মৃতি বিজড়িত স্থান)
  • গোমতী নদী
  • নওয়াব ফয়জুন্নেছার স্বামী গাজী চৌধুরীর বাড়ী সংলগ্ন মসজিদ

কুমিল্লা জেলার রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল

কুমিল্লা (comilla) রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইংরেজি: Comilla Export Processing Zone; সংক্ষেপে যেটি ‘কুমিল্লা ইপিজেড’ নামেও পরিচিত) বাংলাদেশের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, যা বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় শহর কুমিল্লার পুরাতন বিমান বন্দর এলাকায় অবস্থিত।এই রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলটি ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপিত হয়। ২৬৭.৪৬ একর এলাকার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ইপিজেডটি বাংলাদেশের ৪র্থ বৃহত্তম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা।

প্রদত্ত সুযোগসুবিধা

এখানে একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) রয়েছে যাতে রাসায়নিক এবং জৈবিক উভয় পদ্ধতিতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫,০০০ ঘনমিটার বর্জ্য পরিশোধন করা যায়।

প্রতিষ্ঠা

এই রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে মোট ২৩৯ টি শিল্প প্লট রয়েছে, যার মধ্যে ৩৭ টিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে (১৯ টি বিদেশি, ৮টি যৌথ এবং ১০টি দেশীয় মালিকানাধীন) যাতে চীন, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ভারত, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, ইটালী, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, হং কং, মরিশাস, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ওমান এবং বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তাগণ বিনিয়োগ করেছে; এবং ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

কুমিল্লা (comilla) জেলার উৎপাদিত ণ্য

এখানে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে:

  • তৈরি পোশাক,
  • জুতা,
  • ইয়ার্ণ,
  • ফেব্রিক্স,
  • টেক্সটাইল ডাইজ ও অক্সিলিয়ারিস,
  • গার্মেন্ট এক্সেসরিজ,
  • সোফা কাভার,
  • ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী,
  • প্লাস্টিক পণ্য,
  • মেডিসিন বক্স,
  • আই প্যাচ,
  • ক্যামেরা ব্যাগ,
  • কম্পিউটার ব্যাগ,
  • হেয়ার এক্সেসরিজ ইত্যাদি।

কুমিল্লা জেলার প্রখ্যাত ব্যক্তি

মুক্তিযোদ্ধা

  • বিএলএফ-এরসদস্যশিব নারায়ণ দাস , বাংলাদেশের প্রথম পতাকার অন্যতম ডিজাইনার
  • শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮––-১৯71১) আইনমন্ত্রী, ভাষা আন্দোলনের কর্মী ও একাত্তরের শহীদ
  • লেফটেন্যান্ট কর্নেল। আকবর হুসেন (১৯৪২-২০০6), প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা, খনিজ উত্সের প্রাক্তন মন্ত্রী (১৯ 197৮), বন সংরক্ষণের প্রাক্তন মন্ত্রী (১৯৯১), অভ্যন্তরীণ জলের প্রাক্তন মন্ত্রী

রাজনীতিবিদরা

  • খোন্দকার মোশতাক আহমদ (১৯১–-১৯৯৯), বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি , প্রাক্তন মন্ত্রী এবং মেহেরপুর সরকারের নির্বাসন মন্ত্রিসভার সদস্য
  • কাজী জাফর আহমেদ (১৯৯৯-২০১ (), জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী (1988), প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী (1986)
  • গোলাম আযম (১৯২২-২০১৪), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রাক্তন নেতা; অধ্যাপক; রাজনীতিবিদ; দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী
  • খন্দকার মোশাররফ হোসেন , বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রাক্তন মন্ত্রী (১৯৯১) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রাক্তন মন্ত্রী (২০০১)
  • মোস্তফা কামাল (১৯৪–), রাজনীতিবিদ ও ক্রিকেট কর্মকর্তা
  • শওকত মাহমুদ (১৯৫৯-), সিনিয়র সাংবাদিক, সাপ্তাহিক ইকোনমিক টাইমসের সম্পাদক, বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি (২০০–-০৮, ২০০৯-বর্তমান)
  • কুমিল্লায়জন্মনেওয়াপাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ জাহাঙ্গীর খান তারিন
  • মজিবুল হক মুজিব , কুমিল্লা -11 আসনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য এবং বর্তমান বাংলাদেশের রেলমন্ত্রী
  • মোজাফফার হোসসেন পোল্টু , বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো

সামাজিক কর্মী সমাজসেবী

মহিলা শিক্ষার অগ্রণী কবি, নবাব ফয়জুন্নেছা , ফয়জুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা

শিক্ষাবিদ এবং পণ্ডিত

ফজলুল হালিম চৌধুরী , সাবেক উপাচার্য, Dhaka াকা বিশ্ববিদ্যালয়

লেখক

  • বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১7474৪), বাংলা কবি , nove পন্যাসিক , অনুবাদক, সম্পাদক ও প্রাবন্ধিক
  • কাজী নজরুল ইসলাম , পশ্চিমবঙ্গ থেকে, তবে তিনি দীর্ঘদিন কুমিল্লায় অবস্থান করেছিলেন
  • আবদুল কাদির (১৯০–-১৯৮৪), গবেষক, কবি ও সম্পাদক

সুরকারগণ

  • শচীন দেব বর্মণ (1906–1975), এসডি বর্মণ হিসাবে পরিচিত, গায়ক, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক
  • রাহুল দেব বর্মণ , আরডি বর্মণ হিসাবে পরিচিত, এসডি বর্মণের পুত্র, সুরকার এবং বলিউড সংগীত পরিচালনার পথিকৃৎ
  • আলাউদ্দিন খান
  • সুধীন দাস
  • আলী আকবর খান
  • গাজী মাজহারুল আনোয়ার
  • ক্লাসিকালসংগীতেরশিল্পী আলাকা দাস , সংগীত শিখার্থী সম্মিলনের প্রিন্সিপাল (সংগীতকালীন অনুষ্ঠান), কুমিল্লা
  • আসিফ আকবর

অভিনেতা

  • ফেরদৌস আহমেদ বাংলাদেশী অভিনেতা
  • চিন্ময় রায় বাঙালি অভিনেতা কলকাতা, ভারত ভিত্তিক

বডি বিল্ডার

  • মনোহর আইচ

কুমিল্লা জেলার কিছু ছবি 

বিঃদ্রঃ এখানে দেওয়া সকল তথ্য ইন্টারনেট এর বিভিন্ন তথ্যমূলক ওয়েবসাইট ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো তথ্যে ভুল থাকে তাহলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন এবং সঠিক তথ্য দিয়ে ভুল টা সংশোধন করার জন্য আমাদের সাহায্য করবেন এবং এই তথ্য টি পরে যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে তথ্যটি শেয়ার করবেন ।

তথ্যসূত্র:
স্থানীয় লোকজন
https://bn.wikipedia.org
http://www.comilla.gov.bd

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here